১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
অবৈধ দখলে অস্তিত্ব হারাচ্ছে নদনদী
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ১৯, ২০২০ ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশের নদনদীগুলো অবৈধ দখলের কবলে পড়ে অস্তিত্ব হারাচ্ছে। দুই তীর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে লবণের মিল, গ্যারেজ, মাছের ঘের, মুরগির খামার, দোকানপাট, কাঁচা-পাকা ঘরবাড়িসহ নানাবিধ স্থাপনা। রাজনীতিক, সংসদ সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, আমলাসহ প্রায় ৫০ হাজার প্রভাবশালী ব্যক্তি সারাদেশের নদীর জায়গা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। সারাদেশে সম্প্রতি জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণ শেষে এক কার্যপত্রে এই তথ্য উঠে এসেছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেরও সুপারিশ করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। দায়িত্বশীল সূত্রে এ খবর পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, দেশের জেলা প্রশাসন ও নদীরক্ষা কমিশনের তালিকায় নদীর অবৈধ দখলদার হিসেবে প্রভাবশালীদের নাম এলেও উচ্ছেদ অভিযান চলে ধীরলয়ে। কারণ, নদনদীর তীর দখল করা ব্যক্তিরা কেউ রাজনৈতিক নেতা, সাবেক আমলাসহ প্রভাবশালী। এ কারণে প্রশাসন তাদের ‘ঘাঁটা’তে চায় না। অনেক ক্ষেত্রেই থাকে নির্বিকার। অবশ্য সম্প্রতি বুড়িগঙ্গা ও তুরাগতীরে কিছু অভিযান হচ্ছে।

এ বিষয়ে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, ‘দেশের অস্তিত্ব রক্ষায় নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কারণ আমরা আরেকটি তুরাগ-বুড়িগঙ্গা কিংবা ব্রহ্মপুত্র নদ পাব না। নদনদী দখল করে তীরে বা মাঝখানে স্থাপনা গড়ে তোলায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। তাই যে কোনো মূল্যে নদীগুলোকে বাঁচাতে হবে। শুধু রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তি নয়, ব্যবসায়ী, আমলারাও নদীর তীর দখল করে ছোট-বড় শিল্প গড়ে তুলেছেন। নদী দখল করার জন্য মাঠ পর্চাও পরিবর্তন করা হয়েছে, যা দুঃখজনক।’

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নদীর তীর দখল করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে একটা সুপারিশ পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে পর্যালোচনার করতে হবে। কমিশনের করা সুপারিশের মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কতটুকু জায়গা অবৈধ দখলে রয়েছে তা প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে। কারণ, নদীর জায়গা নৌ মন্ত্রণালয়ের বাইরে ভূমি মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়েরও রয়েছে।

সচিব আরও বলেন, অবৈধ দখল এলাকা চিহ্নিত হলে নিয়ম ও বিধি অনুযায়ী সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে। ইতোমধ্যে রাজধানীর চারপাশের নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয়েছে; বাকিগুলো উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান হবে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বলেন, ‘রাজধানীর চারপাশসহ সারাদেশে নদনদীর সীমানা দখল করে যারা অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছেন সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে। রাজধানীর চারপাশের তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর অবৈধ দখলও উচ্ছেদ করা হবে। নদীরক্ষা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী যে নির্দেশনা রয়েছে তা আমরা বাস্তবায়নে সচেষ্ট আছি।’

নদীরক্ষা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে ৪০৫টি নদী এবং ৫৭টি আন্তঃদেশীয় নদী আছে। জলবায়ু পরিবর্তনসহ প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে এসব নদনদী ও জলাশয় বিপন্ন প্রায়। জোরালোভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো ছাড়া নদীরক্ষা করা সম্ভব নয়। এর আগে নদীরক্ষা কমিশন দেশের ৫৫টি জেলা এবং ২০০টি উপজেলায় ৬০টি সভা করে। সারাদেশে নদনদীর সীমানা চিহ্নিত করতে নেমে নানা অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে এই জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

কমিশনের তথ্যে বলা হয়েছে, নদনদী দখলদারদের সংখ্যা মোট ৪৯ হাজার ৭২৩। অবৈধ দখল উচ্ছেদের হার মাত্র ৩০ দশমিক ০৯ শতাংশ। সারাদেশের মতো রাজধানীর প্রধান চারটি নদী তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, বালু ও শীতলক্ষ্যার জায়গা অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে দেশের আট প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের প্রতিষ্ঠান। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে নামে-বেনামে স্থাপনা। এর মধ্যে তুরাগ থানার কামারপাড়া ভাটুলিয়া মৌজার পুরো নদী দখলে রেখেছেন মাহবুবুল হক লোকমান নামে এক প্রভাবশালী। আর আমিনবাজার থেকে বছিলা ব্রিজ পর্যন্ত এলাকাজুড়ে ব্যক্তিগত স্থাপনা গড়ে তুলেছেন জুনায়েদ নামে এক প্রভাবশালী ও তার সাঙ্গোপাঙ্গ। এরা সংখ্যায় ৬২ জন। একইভাবে সাভারের সারুলিয়া মৌজা এলাকা দখলে রেখেছেন লুৎফর রহমান নামে এক প্রভাবশালী। আর তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীর কেরানীগঞ্জ, শ্যামলাপুর ও ওয়াশপুর মৌজায় উচ্ছেদ অভিযান চলমান আছে।

কমিশনের তথ্যে দাবি করা হয়, সাভার থানাধীন বিরুলিয়া ইউনিয়ন বড়বাজার মৌজায় তুরাগের পূর্বপাশে এবং বেড়িবাঁধ পর্যন্ত দখলে রেখেছে জনৈক আবদুল মজিদ খানের টেক্স ইউরোপ বিডি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলাধীন সোহাগপুর টেক্সটাইল মিলসের দখলে এই এলাকার পুরোটাই নদীর জমি। এ ছাড়া আবদুল মান্নান মিয়া এবং খোরশেদ আলম গংয়ের দখলে বুড়িগঙ্গার কেরানীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়ন-ওয়াশপুর, তুরাগের আমিনবাজার এবং গড়ানচটবাড়ী।

বর্তমানে রাজধানীর চারপাশের নদী দখলকারীদের স্থাপনা উচ্ছেদে নেমে দফায় দফায় বাধার মুখে পড়ছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ। প্রভাবশালীদের পক্ষ থেকে দফায় দফায় হুমকি আসছে। আদালতে রিটও হচ্ছে একের পর এক।

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে দখলের কবলে পড়ে নদনদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিপন্ন অবস্থায় পড়েছে কুমিল্লা জেলা। এ জেলায় নদনদীর জমি দখলদার ৫ হাজার ৯০৬ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চট্টগ্রাম জেলা। এখানে দখলদার ৪ হাজার ৭০৪। তৃতীয় অবস্থানে নোয়াখালী জেলা। এখানে নদনদী দখলদার ৪ হাজার ৪৯৯ জন।

এভাবে বিভিন্ন জেলায় দখলদারদের তালিকা রয়েছে ওই প্রতিবেদনে। কক্সবাজারে দখলদার ২৭৮ জন, চাঁদপুরে ৫৩৮, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৬৭৮, ফেনীতে ৩০১, লক্ষ্মীপুরে ১ হাজার ১৫৯, খাগড়াছড়িতে ২৬, বান্দরবানে ৩৬৮, রাঙামাটিতে ৮০, ঢাকায় ৯৫৯, নারায়ণগঞ্জে ৭৮৫, মুন্সীগঞ্জে ৫৭, গাজীপুরে ১০৫, মানিকগঞ্জে ১ হাজার ৩৯৯, শরীয়তপুরে ২৬১, কিশোরগঞ্জে ১২৩, নরসিংদীতে ২৫০, মাদারীপুরে ৩৮৩, গোপালগঞ্জে ৫৪০, রাজবাড়ীতে ২৬, ফরিদপুরে ১ হাজার ৮৩৪, টাঙ্গাইলে ১ হাজার ৭৮৮, খুলনায় ২ হাজার ৮৬৮, নড়াইলে ৯৭, কুষ্টিয়ায় ৩ হাজার ১৩৪, মাগুরায় ১৩৩, ঝিনাইদহে ১৬৯, যশোরে ৬৯৪, সাতক্ষীরায় ৪৮৫, মেহেরপুরে ২২৪, চুয়াডাঙ্গায় ১ হাজার ২৮৩, বাগেরহাটে ২ হাজার ১৫৮, মৌলভীবাজারে ৪১৮, সিলেট ৩৩০, সুনামগঞ্জে ৬৯৬, হবিগঞ্জে ৬০০, ময়মনসিংহে ২ হাজার ৪৭৯, জামালপুরে ৭০৫, নেত্রকোনায় ১ হাজার ৩৮৬, শেরপুরে ২৭৮, রংপুরে ৩০, দিনাজপুরে ১ হাজার ৪৭, নীলফামারী ৭০৯, লালমনিরহাটে ১৩, কুড়িগ্রামে ৫২, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩০৮, পঞ্চগড়ে ১৩৩, গাইবান্ধায় ২৭৬, রাজশাহীতে ১৯৭, নাটোরে ১ হাজার ৫৪১, নওগাঁতে ১৯৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৫, পাবনায় ৩৬০, সিরাজগঞ্জে ২২৫, বগুড়ায় ৪০, জয়পুরহাটে ৮০, বরিশালে ২ হাজার ২৭২, বরগুনায় ১ হাজার ৫৫৪, পিরোজপুরে ১২৯, পটুয়াখালীতে ৯৯৯, ভোলায় ৪৫৪ এবং ঝালকাঠিতে ২০৩। মোট দখলকারী ৫৬ হাজার ৫৬ জন। কমিশনের সুপারিশের আলোকে এখন পর্যন্ত উচ্ছেদ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৮৬৭ জনের স্থাপনা। সরকারের সংশ্নিষ্ট সংস্থা সেখানে দখল নিয়েছে। যার হার ৩০ দশমিক ০৯ শতাংশ।

সূত্রমতে, উচ্ছেদ হওয়া এসব দখলদার প্রভাবশালী নতুুন করে আবার দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে মামলা করে তাদের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান বহাল রাখতে তৎপর রয়েছেন অনেকে। নদীরক্ষা কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অবৈধ দখলদার ৪৯ হাজার ৭২৩ জন।

নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং তা রক্ষার সুপারিশে বলা হয়, নদীর সীমানা চিহ্নিতকরণ ও সীমানা পিলার স্থাপনে কিছু আইনকানুন ও বিধিবিধান মেনে চলতে হবে। সংশ্নিষ্ট বিষয়াবলি সম্পর্কে থাকতে হবে সম্যক ধারণা, যা অযথা আইনি লড়াই ও সিদ্ধান্ত বিভ্রাটসহ হাজারো জটিলতা এড়াতে সাহায্য করবে। এতে করে সময় ও সম্পদ বাঁচবে। উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

এতে আরও বলা হয়, দ্য স্ট্রেট একুইজিশন অ্যান্ড টেনয়েন্স অ্যাক্ট (স্যাটা) ১৯৫০ এর ৮৬ ও ৮৭ ধারার বিধানাবলি এবং সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ৩৫০৩/২০০৯নং রিট পিটিশনের রায়ে যা বলা হয়েছে তা ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, নদীর জমির মালিকানা রাষ্ট্রের। নদীর জমির শ্রেণি পরিবর্তনযোগ্য নয় ও বন্দোবস্ত দেওয়ার যোগ্যও নয়। নদনদীর তীরভূমি, ব্যবস্থাপনা আইন ও বিধিবিধান এবং খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিধিবিধান এক নয়। এসব আইন ও বিধি উপেক্ষা করে প্রভাবশালীরা নদনদীর স্থাপনা অবৈধভাবে দখল করে ভোগদখল করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযানে নামলেই তারা বাধা দেন। ফলে এতে উচ্ছেদ অভিযান পদে পদে বিঘ্ন ঘটে।