১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
আমার গ্রাম আমার শহর প্রকল্পে জনপদের স্বকীয়তা বজায় রেখে গ্রামভিত্তিক সুষম উন্নয়ন প্রয়োজন
প্রকাশিত : নভেম্বর ০৩, ২০২০ ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

ডেস্ক রিপোর্ট: আগে উন্নয়নের দর্শন ছিল শহরমুখী। গত শতকের ষাটের দশকে গ্রাম উন্নয়নে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান এলজিইডি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে গ্রামীণ এলাকায় অভূতপূর্ব যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে। এটাকে রূপান্তরমূলক উন্নতি বলা যেতে পারে। আগে গ্রামে হাঁটার রাস্তা ছিল, রিকশা-ভ্যান চলার রাস্তা ছিল। সেখানে এখন রিকশার বদলে যন্ত্রচালিত যানবাহন প্রতিস্থাপিত হয়েছে এবং দ্রুতগতিতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার মাধ্যম এসেছে। গ্রামীণ অবকাঠামোর ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নে এটিকে ফেনোমেনাল গ্রোথ বলা হয়।

অতীতে অনেক এলাকা বিযুক্ত ছিল, দূরবর্তী ছিল। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা, হাওড় এলাকা, পাহাড়ি এলাকা, চর এলাকাগুলো যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ছিল। জনপদ হওয়া সত্ত্বেও আসলে ভৌত কোনো সংযোগ ছিল না। যা ছিল সেটিকে আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যম বলা যায় না। সেই হিসাবে সারা বাংলাদেশে গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নতির ফলে সম-উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি এলাকার নিজস্ব সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এ কারণে আমাদের সমতামূলক উন্নয়নটা হচ্ছে।

অর্থ খরচ করে আমরা স্বেচ্ছায় অবকাঠামো নির্মাণ করে দিয়েছি, অবকাঠামো নিজে থেকে চাহিদা সৃষ্টি করে নিয়েছে। বিনিয়োগের সনাতনী একটা পদ্ধতি হলো চাহিদা থাকতে হবে, সেটি মেটাতে জোগান দিতে হবে, তাহলেই বিনিয়োগটা টেকসই হবে। পরিকল্পনা কমিশন বলে, চাহিদা আছে, এখন জোগান দেয়া যায়। কিন্তু উন্নয়নের আরেকটি মাত্রাও আছে। সেটি হলো সংযোগহীনতা ও বিচ্ছিন্নতার কারণে কিছু এলাকায় এখনো চাহিদা তৈরি হয়নি। সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নটা প্রথম জরুরি, এর হাত ধরেই চাহিদা সৃষ্টি হবে এবং পরবর্তী রিটার্নও পাওয়া যাবে। এটাকে বলা হয় সাপ্লাই ড্রাইবেন উন্নয়ন, যেখানে সাপ্লাই ক্রিয়েটস ইটস ওন ডিমান্ড। এটি হলো আধুনিক ধ্যানধারণা। আমাদের চিন্তাধারায়ও আধুনিকতার প্রতিফলন ঘটেছে। এ কারণে মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ উন্নয়নে লব্ধ অভিজ্ঞতাগুলো পুরোমাত্রায় আমরা কাজে লাগাতে পেরেছি। সরকারেরও জনপদগুলোকে যুক্ত করার একটি ফোকাস ছিল, ধারাবাহিকভাবে প্রত্যেকেই কিন্তু ফোকাসটা পরিবর্তন করেনি। এক্ষেত্রে এলজিইডি সাধুবাদ প্রাপ্য। সংস্থাটি বিচ্ছিন্ন, দূরবর্তী এলাকাগুলোকে যোগাযোগের মূল প্রবাহের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিয়েছে। আমাদের দেশে একেক সময় একেকটা এলাকা নাজুক ও অরক্ষণীয় ছিল। উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা এলাকাও ছিল, প্রচুর চর ছিল অথচ সেখানে উৎপাদনশীলতা ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে সেগুলো উৎপাদনশীল হয়েছে, অর্থনীতির মূল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে তারা যুক্ত হতে পেরেছে। চর এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে সেখানকার পতিত জমিগুলো কৃষির দিক থেকে এগিয়ে গেছে। চরের মানুষগুলো বিকল্প জীবিকার একটা সন্ধান পেয়েছে। বলা চলে, যোগাযোগ ব্যবস্থা এক্ষেত্রে ক্যাটালিস্ট হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।

গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম ফোকাসটা ছিল প্রবেশগম্যতা (অ্যাকসেসিবিলিটি) দেয়া। এর মাধ্যমেই পরবর্তী রিটার্নগুলো এসেছে। ফলে সম-উন্নয়নের একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, উপকূলীয় এলাকা ও চর এলাকাগুলোয় দ্রুতগতির যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না। এ কারণে তারা নিষ্ক্রিয় ছিল। প্রকৃতির খেয়ালখুশির সঙ্গে তারা জীবনযাপন করত। কিন্তু জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটানোর ফলে তাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটেছে। এলজিইডির গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রোগ্রামে আমি ১০ বছর ধরে কাজ করেছি। কার কী উন্নয়ন লাগবে, তার জরিপ করা হয়েছে এর মাধ্যমে। জরিপের সময় গ্রামের সিনিয়র সিটিজেনরা বলত, আপনারা শুধু আমাদের একটুখানি আলো দেন। নিজেরা আমরা উন্নয়ন করে নেব। আলোটা হলো রাস্তা। সত্যিই তাদের অবকাঠামো পানিতে ডুবে যেত। অতিবৃষ্টির সময় লাইফলাইনগুলো কাজে লাগাতে পারত না। এমনকি সরকারও তাদের কাছে ত্রাণ সরবরাহে প্রতিবন্ধকতার শিকার হতো। উপকূলীয় অঞ্চলে এখন অনেক গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে এবং বেশির ভাগই জলবায়ু সহনশীল। অতিবৃষ্টির সময় এগুলো আর ডোবে না। ফলে বাঁচার উন্নয়নের একটা লাইফলাইন তৈরি হয়েছে।

নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি, রাস্তা একবার হয়ে গেলে তার অ্যালাইনমেন্ট ধরে বিদ্যুৎ চলে গেছে। গতি পাওয়ায় এবং বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলো সংযুক্ত হওয়ায় অন্যান্য সহযোগী সংস্থা চলে গেছে। গ্রামীণ উন্নয়নে একটা বড় ব্যাপার ছিল মানবসম্পদের দক্ষতা বাড়ানো। দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো, কৃষি প্রযুক্তিগুলো এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাতারাতি সেখানে চলে গেছে। কাউকে বলতে হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় সেখানে বিদ্যুৎ চলে গেছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও চলে গেছে। ব্যাংক যাওয়া মানে হলো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকার পাওয়া। কৃষকরা আগে কিন্তু নিজের জমানো টাকা দিয়ে উন্নয়নে ব্যস্ত ছিল। এখন জমি চাষ থেকে শুরু করে চাল প্রক্রিয়াকরণ সবই যান্ত্রিক। কায়িক শ্রম কম, বেশির ভাগই মেকানাইজড হয়ে গেছে। এটা করার জন্য যে প্রযুক্তিগুলো দরকার ছিল তা দোরগোড়ায় পেয়ে যাচ্ছে। ঋণ নেয়ার জন্য ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎও পৌঁছে গেছে। যার ফলে একটি গতিময় ও সপ্রাণ একটি গ্রামীণ অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। আমি উল্লেখ করতে চাই যে গ্রামীণ অভূতপূর্ব আর্থসামাজিক উন্নয়নের গোড়াতেই অবদান ছিল প্রত্যন্ত এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নের অবদান।

আমাদের অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট হয়েছে। কিন্তু এটি পদ্ধতিমাফিক, ইতিবাচক হয়েছে কিনা এবং এর প্রতিক্রিয়া কী হয়েছে, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। আমরা এ ধরনের উন্নয়নের ফলে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পেরেছি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বেশ উন্নতি ঘটেছে। বিশেষত কৃষি উপকরণের জন্য আমাদের অজান্তেই কৃষিতে একটি বিপ্লব ঘটে গেছে। কায়িক শ্রম থেকে যন্ত্রে প্রতিস্থাপনের কারণে উৎপাদনের মাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, আগে গ্রামীণ নারীদের কোনো সচলতা (মবিলিটি) ছিল না, ঘরবন্দি ছিল। এমনকি তাদের নিজের বাড়িতে যেতেও কষ্ট হতো। যদিও দুই-তিন মাইল দূরে, কিন্তু সংযোগ না থাকার ফলে যেতে পারত না। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে নারীদের সচলতা অনেক বেড়ে গেছে। এটি তাদের অনেক ধরনের কাজ করায় উৎসাহিত করেছে। অর্থনীতিতে তাদের যুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে তাদেরও আমরা শ্রমবাজারে নিয়ে আসতে পেরেছি। নিশ্চয়ই তাদের সচলতার জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি বেড়েছে। আমার মতে উন্নয়নটা সামগ্রিকভাবে এমডিজির লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য পরিপূরক ছিল, কিন্তু এসডিজির জন্য যে ভারসাম্যমূলক উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল, তা এখনো দৃশ্যমান নয়।

আমরা নদীমাতৃক দেশ। এখানে নৌপথের অমিত সম্ভাবনা বিদ্যমান। আমরা এটিকে কাজে লাগাতে পারতাম। তা তো কাজে লাগাইনি, বরং সড়কনির্ভর উন্নয়ন করতে গিয়ে ওই সম্ভাবনা বিনষ্ট করে দিয়েছি। টেকসই উন্নয়ন পেতে চাইলে এক মাধ্যমের ওপরে ভরসা করলে জমি যেমন বেশি লাগবে, তেমনি উন্নয়নটাও টেকসই হবে না। কারণ সড়ক কখনই টেকসই উন্নয়ন দেয় না। কেননা তার সক্ষমতা খুব সীমাবদ্ধ।

একটা সময় ছিল শুধু উন্নয়নের পরিমাণগত বিবেচনাই মুখ্য ছিল, গুণগত দিকটির দিকে আমরা তাকাইনি। এমনকি গ্রামীণ সড়ক যা নির্মাণ করেছি তা আমরা অধিগ্রহণ করে করেনি, বরং ডোনেশনের ওপর নির্ভর করেছি। ডোনেশনের জমির গুণগত মান ছিল না। নিশ্চিতভাবে অর্থনীতির প্রথম দিকে প্রবেশগম্যতা (অ্যাকসেসিবিলিটি) দিলেই হতো। এজন্য এলজিইডিকে কোনো জমি অধিগ্রহণের ম্যান্ডেট দেয়া হয়নি, কাউন্সেলিং করে উপকারভোগীদের কাছ থেকে জমি নিতে বলা হয়েছে। ফলে জমি যা পাওয়া গেছে, তাতে আঁকাবাঁকা রাস্তা হয়েছে। সোজা ও গুণগত মানের রাস্তা হয়নি। উন্নয়নের দর্শনটা দূরদর্শী (ভিশনারি) ছিল না, যে কারণে কিছু নেতিবাচক বিষয় চলে এসেছে। এছাড়া একটার উন্নয়ন করতে গিয়ে আরেকটি অকার্যকর (ননফাংশনাল) করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নৌপথের ওপর দিয়ে যেসব সেতু নির্মাণ করা হয়েছে তাতে এর নিচ দিয়ে বড় নৌযান যেতে পারে না। আগে গঞ্জগুলো যেখানে খুব কর্মচঞ্চল ছিল, হাট-বাজার-গঞ্জভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির শত বছরের যে ইকুইলিব্রিয়াম ছিল, সড়কের উন্নয়ন এলোমেলোভাবে করতে গিয়ে নৌপথগুলো পুরোপুরিভাবে অকার্যকর হয়ে গেছে। গঞ্জ ও হাটবাজারগুলো এখন চলে এসেছে মহাসড়কের পাশে। ফলে সড়কগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে।

পুরো বিশ্বেই নৌযোগাযোগের চেয়ে এত সস্তায় কোনো মাধ্যমে পণ্য পরিবহন (ফ্রেইট) নিশ্চিত করা যায়নি। চীন ও ভারতসহ সব দেশই রূপান্তর ঘটিয়ে পণ্য পরিবহন নৌপথে নিয়ে গেছে। সড়কের ওপর চাপটা কমে গেছে। এটাকে বলা হয় বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিক ও টেকসই উন্নয়নের দর্শন। এক্ষেত্রে আমরা কিছু অপূরণীয় ক্ষতি করে ফেলেছি। যা অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছি তা মূলত পরিমাণগত। এলজিইডি তিন লাখ কিলোমিটার রাস্তা করেছে। তার মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার কিলোমিটার সব ঋতুতে পাকা রাস্তা আছে, যেগুলো আমাদের অর্থনীতিকে চাঙা করেছে। কিন্তু পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্য সেগুলো আর যোগ্য হচ্ছে না। কারণ আঁকাবাঁকা রাস্তা। বড় বড় ট্রাক চলতে পারে না। বাঁকগুলো বিপজ্জনক। একটি খারাপ প্রবণতা রয়েছে যে রাস্তা পেলেই মানুষ তার পাশে বাজার-ঘাট, দোকানপাট প্রভৃতি স্থাপন করে। সড়ক যে আরো সম্প্রসারিত করবে তার জো থাকে না।

সড়ক উন্নয়নের যেকোনো দূরদর্শী পরিকল্পনা হলো সড়ক উন্নয়ন করা হবে এবং সম্প্রসারণের কিছু জায়গা রেখে দেয়া হবে। কারণ অর্থনীতি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সড়ক বাড়াতে হবে। আমাদের দেশে তা হয়নি। এসব দূরদর্শী চিন্তা করার জন্য কোনো পেশাদারি প্রতিষ্ঠানও ছিল না। এখন উন্নয়নের জোয়ার সামাল দিতে ভারী গাড়িগুলো ছুটতে চাইলে আঁকাবাঁকার জন্য জ্যামিতিকভাবেও পারছে না, কাঠামোগতভাবেও পারছে না। এলজিইডির রাস্তাগুলো নির্মাণ করা হয়েছে ছোট ছোট গাড়ির জন্য। এখন ওই সব রাস্তা দিয়ে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে ২০-২২ টনের ট্রাকগুলো চলছে। ফলে ক্ষতি হচ্ছে রাস্তার। ওই সব রাস্তা ভারটা কম নেয়ার হিসাব করে নির্মাণ করা হয়েছে। সে কারণে দেখা যাচ্ছে রাস্তাগুলো ভেঙে যাচ্ছে। সেদিক থেকে বলা যায়, নির্মিত অবকাঠামো পরের মাত্রায় যাওয়ার জন্য জ্যামিতিক ও কাঠামোগত উভয় দিক থেকেই ঠিক নয়। এদিকটা আমাদের চিন্তা করতে হবে। তাই জরুরি ভিত্তিতে এলজিইডির আঁকাবাঁকা যেসব রাস্তা আছে সেগুলো সোজা করে গুণগত মান বাড়াতে হবে। এতে সেগুলোর কার্যকারিতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে।

প্রতিটি জায়গায় আমরা শুধু জট লাগার উন্নয়ন করেছি। ব্রিজ করে নিচে জট লাগিয়ে দিয়েছি এবং পানিপথ নষ্ট করেছি, রেলপথের সঙ্গে এলোমেলো অননুমোদিত লেভেল ক্রসিং করে ফেলেছি। মহাসড়কে ওঠার আগে যে ব্যাকরণ মানা উচিত তা মানা হয়নি। গ্রাম্য রাস্তা কখনো মহাসড়কে আসবে না। সেখানে আমরা কোনো দর্শনের প্রতিফলন ঘটাইনি। আমাদের রাস্তা ছয় ধরনের। সড়ক ব্যবস্থার বিন্যাস অনুযায়ী, সবচেয়ে ধীরগতির ও নিম্নমানের রাস্তা হবে গ্রামের রাস্তা। তার এত গতি দরকার নেই। ওই সব রাস্তা জাতীয় মহাসড়কে সরাসরি আসবে না। এলেও উপকৃত হবে না, দুর্ঘটনায় পড়বে এবং জাতীয় মহাসড়কের কার্যকারিতা ব্যাহত করবে। সামগ্রিকভাবে বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করার জন্য ব্যবহূত জাতীয় অবকাঠামোগুলোকে অকার্যকর করে তুলবে।

এসডিজি লক্ষ্য পূরণ করতে চাইলে একটার উন্নয়ন কখনই অন্যটির বাধা হবে না। একটা উন্নয়ন দিয়েই আমরা অনাগত ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করতে পারব না। সেই দর্শনের কাছাকাছি আমরা নেই। সড়কের প্রসঙ্গ এলে আমাদের অবশ্যই সড়কের সঙ্গে লাগোয়া ভূমি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও আসবে। ভূমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ না করলে সড়ক কোনোদিন ফাংশনাল হবে না। শুধু সড়ক নির্মাণ না, পাশ থেকে যে চাপটা আসবে সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কেবল সড়কের দিকে তাকালে কোনোদিন সড়কের উন্নয়নটা টেকসই করা যাবে না। সড়ক ও তার সংলগ্ন পরিপার্শ্বের উন্নয়ন সমন্বিত হতে হবে।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করব, গ্রামের সড়ক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমরা গ্রামীণ হাট-বাজারের উন্নয়ন করতে গিয়ে দেখেছি অনেক ঐতিহ্যবাহী বাজার চলে এসেছে মহাসড়কের পাশে। এ পরিবর্তনটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এমনটি হলে মহাসড়কের চাপ বেড়ে যাবে। সেগুলো নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ দিতে পারবে না। রক্তক্ষরণের উন্নয়ন হবে। এখানো পণ্যবোঝাইকারী গাড়িগুলো যখন পার হয়, তখন অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। শুধু তাই নয়, গ্রামীণ পাকা রাস্তার কারণে আমাদের অভ্যাসগত পরিবর্তনও ঘটছে। আগে আমরা হেঁটে যেতাম। বড়জোর সেখানে চলত রিকশা। সেই জায়গায় এখন চলছে যান্ত্রিক যানবাহন, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক প্রভৃতি। সুতরাং সড়কের পরিসরটাকে আমরা সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি সঞ্চারে ব্যবহার করতে চাইলে ইজিবাইক-মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় ইজিবাইক কিন্তু এখন সব বাহনের মেরুদণ্ড হয়ে যাচ্ছে। সবাই আমরা ইজিবাইক, মোটরসাইকেল, সিএনজি দিয়ে চলাচল করছি। এগুলো স্থায়িত্বশীলতা দেয় না। কারণ এগুলো রাস্তার স্পেসটা দ্রুত দখল করে ফেলে। আমাদের যেহেতু স্পেস কম, সেহেতু এটিকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হলে উন্নয়নের বাহন হতে হবে বাস। এটিকে অবজ্ঞা করার কারণে ছোট ছোট যানবাহন রাস্তায় উঠে এসেছে। দিচ্ছে দ্রুতগতি, বাস হয়তো দিতে পারবে না। কিন্তু পুরো পৃথিবীই জানে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাটাই সামগ্রিকভাবে টেকসই উন্নয়নের বড় হাতিয়ার। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছোট ছোট গাড়ি ব্যবহার করতে দিলে অন্তত সড়ক বানিয়ে যে দূরবর্তী স্বপ্ন দেখছি তা পূরণ হবে না।

একটি ছোট মফস্বল শহর বা জেলার নগরায়ণ আর কিছুই নয়, কয়েকটি রাস্তা আর বাহন হিসেবে আছে ইজিবাইক, সিএনজি ও মোটরসাইকেল। কারো বিকল্প জীবিকা দরকার, চাকরি পাচ্ছে না, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে একটা ছোট গাড়ি কিনছে। এগুলো কিন্তু আমাদের জন্য হুমকি। আমাদের পরের অর্জন, এসডিজি লক্ষ্য পূরণের জন্য হুমকি।

আমাদের উন্নয়নটা সম্পূর্ণভাবে ভৌত উন্নয়ন হয়েছে। এ উন্নয়ন নির্মাণকর্ম চালিত, সিস্টেমচালিত নয়। পরিবহন ব্যবস্থা একটা সিস্টেম। যার মধ্যে প্রথমে থাকবে গবেষণা ও পরিকল্পনা, এরপর আসবে ডিজাইন ও নির্মাণ, তারপর আসবে মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন এবং সর্বোপরি নিয়ন্ত্রণ। শুধু সড়ক নয়, আশপাশে সমন্বিতভাবে ভূমি ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণও জরুরি। সিস্টেমটা কখনই আমরা ধারণ না করাতে পরবর্তী উন্নয়নের জন্য তা সহযোগী হবে না। বরং প্রতি-উৎপাদনমূলক হবে। যদিও এলজিইডির অর্পিত দায়িত্ব ছিল সামগ্রিক পরিকল্পনা করে গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন করবে, যাতে নেতিবাচক কোনো প্রভাব না পড়ে। ইদানীং আমরা দেখতে পাচ্ছি যে গ্রামীণ অবকাঠামো শুধু এলজিইডি করছে না, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগও করছে, যেখানে কোনো প্রকৌশল ইউনিটই নেই। অর্থ পেয়েছে, নির্মাণ করছে। এখানে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, মন্ত্রীরা যে থোক বরাদ্দ পায়, তা দিয়েও রাস্তা নির্মাণ করা হয়। রাস্তা ভালো, কিন্তু সমন্বিত না হলে তা দুর্ভোগের কারণ হয়। বাছবিচার না করে বাঁধ তৈরিপূর্বক তার ওপর সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। একটি বাঁধ তৈরি করলে বন্যার পানি আটকে যায়। বৃষ্টির পানি আটকে যায়। তখন ফসলি জমি কিছুদিনের জন্য তলিয়ে যায়। সেজন্যই পরিকল্পনা প্রয়োজন। পানি নিষ্কাশন একটা বিরাট যন্ত্রণার কাজ। পানি স্বাভাবিক গতিতে নিষ্কাশন হওয়ার কথা, কিন্তু বাঁধ দিলে এর স্বাভাবিক গতিটা আটকে যায়। আটকে যাওয়া মানে বেশিদিন ধরে পানিটা জমা থাকে। নিষ্কাশন হয় না। এর কারণ পরিকল্পনাহীনতা ও সমন্বয়হীনতা। এক বিভাগের হয়তো মাস্টারপ্ল্যান ছিল, আরেকটি সেটি জানছে না। সড়ক নির্মাণে বহু প্রতিষ্ঠান যুক্ত, কিন্তু একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো সমন্বয় নেই। এটা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে।

ইদানীং দেখা যাচ্ছে, হাওড় এলাকার জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট করা হচ্ছে। এতদিন সেখানে ডুবো রাস্তা ছিল, কিন্তু এখন বড় বড় বাঁধ তৈরি করে পাকা সড়ক নির্মাণ করায় ওই এলাকার প্রতিবেশ ব্যবস্থা বিনষ্ট হয়েছে। হয়তো যোগাযোগ ব্যবস্থা দিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন করা হলো কিন্তু কী ক্ষতির বিনিময়ে সেটি করা হচ্ছে, তা বিবেচনা করা দরকার। পানির ওপর সড়ক হয়েছে। দেখতে খুব ভালো লাগে এবং তা দেখতে অনেক সুন্দর ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের আগমন অবশ্যই সড়কের দুই ধারের ভূমি প্রকৃতি পরিবর্তনে উৎসাহ জোগাবে। ফলে সড়কের পাশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে টানা দোকান হয়ে একদিকে যেমন দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে, অন্যদিকে আগত মানুষ ও দোকানপাটের বিভিন্ন বর্জ্য হাওড়ের পানি দূষিত করার মাধ্যমে জীববৈচিত্র্যের সম্যক ক্ষতির কারণ হতে পাড়ে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকবে, যা স্বর্গীয় আশীর্বাদপুষ্ট হাওড়ের অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমির জন্য কাম্য হতে পারে না। হাওড় অঞ্চলে বাঁধের ওপর নামা সড়ক তৈরি ধারাবাহিকতায় হয়তো আরো নতুন সড়ক হবে এবং রেললাইনও তৈরি করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এভাবে এ বাঁধনির্ভর অবকাঠামো উন্নয়ন, বিস্তীর্ণ জলাধারাকে মণ্ডিত/বিমণ্ডিত করে শুধু যে হাওড়ে অত্যন্ত নাজুক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে ফেলবে তা না, এছাড়া পানির প্রবহমান স্বাভাবিক ধারা বাধাগ্রস্ত করে ও পানি সরে যেতে বিলম্বিত করে এ এলাকার ফসলি জমিতে শস্য আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত করার একটি বড় কারণ হতে পারে। তাই হাওড় এলাকায় যদি সব ঋতুসংবলিত যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি করতে হয়, তবে তা আরো আধুনিক পরিবেশবান্ধব, পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করবে না ও কম জায়গায় হতে হবে। সেই ধরনের টেকসই উন্নয়ন দর্শন অনুসরণ করা উচিত। বিশ্বের অনেক দেশেই জলাশয়ে অবকাঠামো নির্মাণ-খুঁটির ওপর করে থাকে, যাকে কজওয়ে বলে।

এছাড়া আমার শঙ্কা হয়, ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ কর্মসূচি আমরা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারব কিনা। এটি দেশব্যাপী উন্নয়নের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। যেহেতু গ্রামীণ উন্নয়নের স্বতন্ত্র কোনো পেশাদারি প্রতিষ্ঠান নেই, সেহেতু বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের দিকেই নজর থাকবে। গ্রাম গ্রামীণ বৈশিষ্ট্যেই থাকা উচিত। তার মধ্যে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মানুষ যেন শহরে না আসে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। নিজ নিজ এলাকায় মানুষের থাকার মতো ও কর্মসংস্থানের একটা যদি ব্যবস্থা করা যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে। এখন গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামো প্রকল্প যারাই বাস্তবায়ন করছে, তারা সব সময় নির্মাণকাজকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এটি সবচেয়ে সহজ কাজ। শুধু ভৌত উন্নয়ন করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী প্রভৃতি শহরকে আমরা অবকাঠামোর জঞ্জালে পরিণত করেছি। ঢাকা এখন বসবাসযোগ্য নগরীর তলানিতে। গ্রামকেও যদি উন্নয়ন করতে গিয়ে—যেহেতু পেশাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নেই—স্বকীয়তা নষ্ট করে শহরের মতো নগরায়ণ করে ফেলি আর সেটি উন্নয়ন বলি তাহলে একটা বিরাট বিপর্যয় হবে। কাজেই এটা সম্পর্কে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। পেশাদারি হতে হবে। জানা লোকদের দিয়ে পরিকল্পনা করাতে হবে, যাতে অবকাঠামো ও ফিজিক্যাল ডেভেলপমেন্টই উন্নয়ন না হয়। এমনটি হলে বাকি যাত্রাও আমাদের সুন্দর হবে। ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ খুবই সুন্দর স্লোগান। এর মানে হলো আর এলোমেলো হতে দেয়া হবে না। কিন্তু তার জন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো না থাকলে শুধু উন্নয়নই হবে, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে উঠবে না। কাজেই ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ কর্মসূচির ক্ষেত্রে আমাদের ভিন্নতর চিন্তাভাবনার সম্মিলন জরুরি। তাই পরিকল্পিত সামগ্রিক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি নিরপেক্ষ পেশাদারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা তৈরির মাধ্যমে নদীমাতৃক এ দেশের জলাভূমি, খাল, বিল রক্ষা করা ও গ্রামীণ জনপদের স্বকীয়তা বজায় রেখে ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে বাংলাদেশকে গ্রামভিত্তিক সুষম উন্নয়ন করা এখন একটি সময়ের দাবি।

লেখক: ড. এম সামছুল হক: বুয়েটের অধ্যাপক
যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ