১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
এক দশক পর আবাসন খাতে আবারো বাবলের ইঙ্গিত
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৯, ২০২০ ৫:২৯ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

দেশের আবাসন খাতের জন্য সবচেয়ে ভালো সময় ছিল গত দশকের শেষ ভাগ। ২০১০ সালে সর্বোচ্চে উঠেছিল ফ্ল্যাটের দাম। এরপর হঠাৎ ধস নামে এ খাতে। দীর্ঘ সময়জুড়ে মন্দায় থাকা আবাসন খাতকে টেনে তুলতে বেশকিছু নীতিসহায়তা দিয়েছে সরকার। যার প্রভাবে এক দশক পর আবাসন খাতে আবারো মূল্যবৃদ্ধিতে উল্লম্ফনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। করোনার মধ্যেও বাড়ছে ফ্ল্যাট বিক্রি ।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রেজিস্ট্রেশন খরচ কমিয়ে আনা, বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রাখাসহ সরকারের নানা পদক্ষেপের ফলে ফ্ল্যাট ক্রয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে মানুষ। এতে ২০১০ সালের মতোই দাম বাড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ২০১০ সালে ফ্ল্যাটের দাম বর্গফুটপ্রতি ৭ হাজার টাকা ছিল। চাহিদার নিম্নমুখিতায় ২০১৫ সালের দিকেও একই দামে কেনাবেচা হয়। তবে বর্তমানে ওই এলাকায় প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ৯ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে।

শুধু মোহাম্মদপুর নয়, রাজধানীর সব এলাকায়ই কম-বেশি ফ্ল্যাটের দাম বাড়তে শুরু করেছে। শীর্ষ আবাসন প্রতিষ্ঠান শেলেটক্ ও আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব সূত্রে জানা গেছে, কলাবাগান এলাকায় প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ২০১০ সালে ছিল ৭ হাজার টাকা। ২০১৫ সালেও এ দামে কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু বর্তমানে প্রতি বর্গফুটের দাম ৯ হাজার ৫০০ টাকায় উন্নীত হয়েছে।

রাজধানীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত বনানীতে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ২০১০ সালে ছিল ১৩ হাজার টাকা। ২০১৫ সালে তা কমে ১১ হাজার টাকায় নেমে আসে। বর্তমানে দাম বেড়ে প্রতি বর্গফুট ১৩ হাজার ৫০০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। একইভাবে ২০১৫ সালের তুলনায় ফ্ল্যাটের দাম বেড়েছে ধানমন্ডি, গুলশান, বারিধারা, লালমাটিয়া, মিরপুর, উত্তরা, শ্যামলী, কলাবাগান ও শান্তিনগর এলাকায়। রাজধানীর এ ১১টি এলাকার গড় দাম বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৫ সালে ফ্ল্যাটের গড় মূল্য ছিল বর্গফুটপ্রতি ৩ হাজার ৬৪ টাকা। ২০১০ সালে এই দাম বেড়ে হয় ৯ হাজার ৫০০ টাকা। ২০১৫ সালে দাম পড়ে গিয়ে ৯ হাজার ৯১ টাকায় ঠেকে। ২০২০ সালে দাম আবার বেড়ে বর্গফুটপ্রতি ১১ হাজার ৪৫৫ টাকায় উন্নীত হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার নতুন নীতি সুবিধার ঘোষণা দিয়েছে। এতে মানুষের ফ্ল্যাট কেনায় আগ্রহও বেড়েছে। যার প্রভাবে আবাসন খাতের বিক্রিও কিছুটা ভালো। তবে তাদের দাবি, দাম যতটা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ততটা বাড়েনি। বর্তমানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তা মূলত দাম সংশোধন।

রিহ্যাবের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, করোনার প্রভাবে অর্থনীতিতে যে ধসের আশঙ্কা ছিল বাস্তবে ততটা ঘটেনি। কারণ সরকার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেমন আবাসন খাতে রেজিস্ট্রেশন খরচ কমেছে, সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা হয়েছে, অপ্রদর্শিত আয় বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ সুবিধাগুলো অর্থনীতিকে টেনে তুলতে সহায়তা করছে, যার প্রতিফলন আবাসন খাতেও দেখা যাচ্ছে। উত্তরায় বিক্রি বেশ ভালো বলে জানতে পেরেছি। মেট্রো রেলের প্রভাবও আবাসন ব্যবসায় পড়তে শুরু করেছে। যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নয়নের আশায় মানুষের মধ্যে চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে।

দেশে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এ কারণেও অনেকে আবাসন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। করোনার ধাক্কা সামলে আবারো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে আবাসন খাত।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াসের (বিটিআই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান খানের সঙ্গে, যিনি এফআর খান নামে বেশি পরিচিত। তিনি বলেন, জুনের পর থেকে আবাসন খাতের ব্যবসা একটু একটু করে চাঙ্গা হতে শুরু করে। এখন বেশ ভালোই বিক্রি হচ্ছে। করোনা মহামারীর মধ্যেও অনেকেই ফ্ল্যাট কেনার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। আবার মেট্রো রেলসহ রাজধানীকে ঘিরে যোগাযোগ ব্যবস্থাকেন্দ্রিক যেসব অবকাঠামো গড়ে উঠছে, তার একটি প্রভাব আছে এতে। অনেক ক্রেতা শহরের বাইরে গিয়ে নিজেদের বাজেটের মধ্যে ফ্ল্যাট কেনার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। অনেকেই আমাদের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলাপ করছেন। আবাসন খাতের জন্য এসব ইতিবাচক দিক বলে মনে করি আমি। তবে এখনো এ খাতে বেশকিছু সমস্যা রয়ে গেছে। আবাসন খাতসংশ্লিষ্ট কিছু কিছু উপকরণের দাম অনেক বেশি। আবার নির্মাণ খাতের কিছু নীতিমালা এ খাতের বিকাশের জন্য বাধার সৃষ্টি করছে। সেসব বাধা দূর হলে এ খাত আরো ভালো করবে।

৯০ দশক-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির পরিবর্তিত ধারার সূচনালগ্নে নির্মাণ খাতে তেজি ভাব আসে। নতুন নতুন শিল্প স্থাপন, করপোরেট অফিস, আবাসনসহ অন্যান্য খাতে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণের ফলে সে সময় এ খাতে রমরমা অবস্থা ছিল। ফলে সবাই বিভিন্ন ধরনের ফ্ল্যাট তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়। ২০০৯ সালের পর দেশে আবাসন খাতের চাহিদা বাড়তে থাকায় নতুন নতুন ডেভেলপার এ খাতে ব্যবসা শুরু করেন। তবে সে বছর আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধের ঘোষণায় কিছুটা চাপে পড়ে এ খাত। ২০১২ সালের মধ্যে বিক্রয়যোগ্য ফ্ল্যাটের সংখ্যা চাহিদাকে ছাড়িয়ে যায়। গত কয়েক বছরে চাহিদা কমে যাওয়ায় দামও কমেছে। তবে এখন চাহিদা বাড়ায় দামও কিছুটা বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বাড়তে বাড়তে একটি স্থিতাবস্থা চলে আসে। দেশের আবাসন খাতে এখন এক ধরনের স্থিতাবস্থা বিরাজ করছে। আর দাম বাড়ার বা কমার সম্ভাবনা নেই। তাই আবাসন খাতে বিনিয়োগের এখনই সুসময়। আবার করোনা মহামারীর ফলে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, সেটিও কেটে গেছে। ফলে সবাই আবার ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ করছেন।

ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বিপণন বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ ফরহাদুজ্জামান বলেন, আবাসন খাতের জন্য বাজেটে বেশকিছু সুবিধা দেয়া হয়েছিল। আবার সরকারি কর্মকর্তাদেরও এ খাতের জন্য বেশকিছু সুবিধার ঘোষণা রয়েছে। এখনকার রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাও এ খাতের জন্য ইতিবাচক। এসব কিছু নিয়েই এ খাতের ব্যবসা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো যাচ্ছে। ক্রেতারাও নতুন নতুন ফ্ল্যাটের ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। আমাদের বিক্রিও বাড়ছে।