১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
করোনায় প্রয়োজন বাড়লেও গতি নেই ইন্টারনেটের
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ০২, ২০২০ ৪:৪৯ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

ডেস্ক রিপোর্ট: করোনাকাল প্রয়োজন বাড়িয়ে দিয়েছে ইন্টারনেটের। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যমকর্মী, বিভিন্ন পেশাজীবীসহ প্রায় সবারই ইন্টারনেট বা ডাটা সেবায় নির্ভরতা বেড়েছে। বিনোদনও এখন হয়ে উঠেছে ইন্টারনেটকেন্দ্রিক। জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি সেবা, করোনা টেস্টের সিরিয়াল পাওয়া—এসব কাজও এখন ইন্টারনেটনির্ভর। এ কারণে মোবাইল অপারেটরদের ডাটা প্যাকেজ বিক্রি এবং সেই সঙ্গে আয়ও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। কিন্তু সংকটের এই কালে গ্রাহকরা অতিরিক্ত ব্যয় করেও যথাযথ সেবা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

দেশে করোনা শুরু হওয়ার পর থেকেই ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কম থাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ডাটা কিনেও তাঁরা প্রয়োজন মেটাতে পারছেন না। আবার নির্ধারিত মেয়াদে তা শেষও করতে পারছেন না। ফলে এক ধরনের প্রতারণার শিকার তাঁরা। ঢাকার বাইরের অবস্থা আরো শোচনীয়। সব মোবাইল অপারেটরের সিম সব এলাকায় কাজ করে না। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও চাহিদা মেটাতে পারছে না। অথচ দেশের দুটি সাবমেরিন কেবল থেকে পাওয়া প্রচুর পরিমাণে ব্যান্ডউইডথ অব্যবহৃতই থেকে যাচ্ছে।

এই সংকট নিয়ে মোবাইল ফোন গ্রাহকদের একটি সংগঠন গত ২৮ নভেম্বর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব, বিটিআরসি চেয়ারম্যান ও চার মোবাইল ফোন অপারেটরদের প্রধান নির্বাহীদের আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়। এবং বলা হয়, অন্যথায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এই আইনি নোটিশ সম্পর্কে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন এমটবের মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস এম ফরহাদ বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমরা কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।’

এ বিষয়ে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন এমটবের মহাসচিব বলেন, ‘হঠাৎ করে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী শহর থেকে গ্রামে চলে যাওয়ায় মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অপারেটররা গ্রাহকদের কথা বিবেচনা করে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাটার মূল্য কমিয়ে বেশি ডাটা দেওয়ায় এর ব্যবহার বেড়ে যায়। তদুপরি গ্রাহকরা অফিস, ব্যবসা, শিক্ষা, বিনোদন এবং অন্যান্য অনেক কাজ ঘরে বসে অনলাইনে করছেন, যে কারণে ইন্টারনেটের ওপর চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মোবাইলের ওপর নির্ভর করে। যার জন্য পর্যাপ্ত ব্যান্ডউইডথ প্রয়োজন। তবে ইচ্ছা ও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত দামের কারণে অপারেটররা স্পেকট্রাম বরাদ্দ নিতে পারেনি। এসব কারণে সামগ্রিকভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেটের গতি হ্রাস পাচ্ছে।’

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগও সমস্যার বিষয়টি অস্বীকার করছে না। এ বিভাগের মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘করোনা শুরু হওয়ার আগে মোবাইল ফোন অপারেটররা ইন্টারনেট সেবাকে ব্যবসা হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। এ জন্য প্রয়োজনীয় স্পেকট্রামও সংগ্রহ করেনি তারা। এখন বিষয়টি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তারা।’ তিনি বলেন, ‘মোবাইল ইন্টারনেট সেবার মান উন্নত করার জন্য প্রয়োজন আরো বেশি স্পেকট্রাম ও ফোরজি হ্যান্ডসেট। মোবাইল অপারেটররা আগে প্রয়োজনীয় স্পেকট্রাম কিনতে আগ্রহী ছিল না। তারা ২০১৮ সালে খুবই সামান্য পরিমাণে স্পেকট্রাম কেনে। গ্রামীণফোনের এখন ১০০ মেগাহার্জ স্পেকট্রাম প্রয়োজন। কিন্তু আছে ৪০ মেগাহার্জ। রবিরও স্পেকট্রাম সংকট রয়েছে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব স্পেকট্রাম নিলামের আয়োজন করছি। করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে এই নিলামের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্ত্রী বলেন, অন্য স্পেকট্রামের সঙ্গে ফাইভজি স্পেকট্রামও নিলাম হবে। আগামী বছরের প্রথম দিকেই এটা করা হবে। আমরা দেশে ফোরজি হ্যান্ডসেট উৎপাদনের জন্য জোর দিচ্ছি। টাওয়ার কম্পানি নিয়ে যে সমস্যা ছিল তাও দূর হতে চলেছে। আমরা মোবাইল অপারেটরদের নির্দেশ দিয়েছি এ বছরের মধ্যেই দেশে ফোরজির ৮০ শতাংশ কাভারেজ সম্পন্ন করতে হবে।

ঢাকার বাইরের দুর্ভোগ : ঢাকার বাইরে ইন্টারনেট সেবার যে অবস্থা তুলে ধরেছেন তা থেকে জানা যায়, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট বিড়ম্বনায় ভুগছেন হাজার হাজার গ্রাহক। সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় রয়েছেন উপজেলা প্রশাসনিক এলাকা, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকা ও উপজেলা সদরের কলেজ রোডের এক কিলোমিটার এলাকার গ্রাহকরা। সেখানে মোবাইল ইন্টারনেটে গতি নেই বললেই চলে। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের (আইএসপি) ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও গতিহীন।

উপজেলার চৌমুহনী, ভানুগাছ বাজার, শমসেরনগরসহ পাঁচ-ছয়টি এলাকা ছাড়া বাকি এলাকায় নেটওয়ার্কের অবস্থা খুব খারাপ। মোবাইলে ফোরজি নেট দেখালেও গ্রাহকরা পান থ্রিজি নেট। অনেকেই সব অপারেটরের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেও সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না। নেটের দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজের অনলাইন ক্লাস করতে পারছে না। এ ছাড়া একটি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোতে ইনফো সরকার-ফেইজ-৩-এর আওতায় সংযোগকৃত ইন্টারনেটে নেই গতি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয় সেবাগ্রহীতাদের। কমলগঞ্জ উপজেলা সদরে ‘ফ্রেন্ডর ওয়াইফাই ও পেইজ আইটি ব্রডব্যান্ডের’ গতি দেওয়ার কথা পাঁচ এমবিপিএস অথচ দেওয়া হচ্ছে ৬৭০ কেবিপিএস। পৌর সদরের চণ্ডিপুর এলাকার সালাহউদ্দীনসহ আরো অনেকের এ অভিযোগ।

মুন্সীবাজার ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার পরিচালক এবাদুল হক জানান, সরকারি নেটেও দুর্ভোগে পড়তে হয়। গ্রাহকদের জন্ম নিবন্ধনসহ অন্যান্য কাজ ইন্টারনেটে করতে হয়। কিন্তু নেট দুর্বলতার কারণে দেরি হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসের সিএ রাজেন কৈরী বলেন, ‘সরকারি অফিসগুলোতে যে বিসিসি ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়া হয়েছে তার গতি এত কম যে ব্যবহার করা যায় না। কাজকর্মে বিঘ্ন ঘটছে।’

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলায় প্রথমবারের মতো ডিজিটাল টেলিফোন সেবা প্রদান করে সরকারি সংস্থা বিটিসিএল। পাশাপাশি সংস্থাটির সংযোগ থেকে ধীরগতির ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যেত। মোবাইল অপারেটরগুলোর ইন্টারনেট সেবা চালু হওয়ার পর তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে বিটিসিএল টিকতে পারেনি। এরপর নান্দাইলে চালু হয় ব্রডব্যান্ডভিত্তিক গতিসম্পন্ন ইন্টারনেটে আনলিমিটেড সেবা। উপজেলা সদরে বর্তমানে চারটি প্রতিষ্ঠানের ব্রডব্যান্ড চালু আছে। ঢাকা থেকে ব্যান্ডইউডথ নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে সার্ভার বসিয়ে গ্রাহকদের কেবলের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে। বাসায় রাউটার বসিয়ে একটি লাইন থেকে ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে একাধিকজনে ব্যবহার করছে নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে।

রংপুরের বদরগঞ্জে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাণিজ্যসহ সব কিছুতেই চলছে ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যবহার। রোগীরা বিভিন্ন চিকিৎসকের সঙ্গে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। কিন্তু ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ফোন অপারেটরদের ইন্টানেটের ধীরগতির কারণে চরম ভোগান্তির মুখে পড়ছেন ব্যবহারকারীরা। গতকাল স্টেশন রোডের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সাফন কুমার দাস বলেন, ‘ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আমরা সংযোগ নিয়ে ব্যবসা করছি। তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ফাইভ এমবিপিএস হিসেবে। কিন্তু আমরা টু থেকে থ্রি এমবিপিএস সেবাও পাচ্ছি না। তার ওপর হঠাৎ নেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অভিযোগ করা হলেও কাজ হয় না। এতে লোকশান গুনতে হচ্ছে আমাদের।’

বদরগঞ্জ পৌর শহরের সিও বাজার এলাকায় বাংলাদেশ কম্পিউটার এডুকেশন (বিসিই) শাখার পরিচালক রেজাউল করিম লেবু বলেন, ‘আমি ব্রডব্যান্ড লাইন ব্যবহার করি। স্পিড অনেক স্লো। মাঝে-মধ্যে এমনিতেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ওই সময় মোবাইল কম্পানিগুলোর মডেম ব্যবহার করে সেবা নিতে চাইলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। ফোরজি দেওয়ার কথা থাকলে পাওয়া যায় টু থেকে থ্রিজি। প্রায় একই ধরনের ভোগান্তিতে এরশাদ হোসাইন। তিনি বলেন, ‘টাকা দিয়ে যে পরিমাণ স্পিড কেনা হয়, সেই পরিমাণ স্পিড থাকে না। এতে সাধারণ গ্রাহকদের ঠকানো হচ্ছে।’

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট গতি ওঠা-নামা করতে থাকে। সব অপারেটরের সেবা এক রকম নয়। সেবার মানের তারতম্যের কারণে বাধ্য হয়ে সিম পরিবর্তন করছেন অনেকেই।

মোবাইল ইন্টারনেট স্পিড মিটার ও ফাস্টডটকম ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট গতি পাচ্ছেন বাংলালিংক গ্রাহকরা। বাংলালিংকে সর্বনিম্ন ইন্টারনেট ডাউনলোড গতি প্রতি সেকেন্ড ৭০০-৮০০ কিলোবাইট ও সর্বোচ্চ এক মেগাবাইট পর্যন্ত। তবে গ্রামগঞ্জ ও চরাঞ্চলের গতি ২০০ কিলোবাইটে দাঁড়ায়। একটি অপারেটর গ্রাহকদের ইন্টারনেট গতির অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। তাদের নেটওয়ার্ক টাওয়ার এলাকায় ইন্টারনেট ডাউনলোড গতি সর্বোচ্চ ২২০ কিলোবাইট। আর গ্রামগঞ্জ ও চরাঞ্চলে এর গতি মাত্র ১০-১৫ কিলোবাইট। গ্রাম এলাকায় থ্রিজি সেবা টুজিতে নেমে যায়। আর ঘরের ভেতরে থ্রিজি নেটওয়ার্ক পেলেও ইন্টারনেট গতি শূন্যে নেমে আসে।

আরেকটি অপারেটরের প্রতি সেকেন্ড ইন্টারনেট ডাউনলোড গতি নেটওয়ার্ক টাওয়ার এলাকায় ১৫০-২০০ কিলোবাইটে ওঠা-নামায় সীমাবদ্ধ। আর গ্রামগঞ্জে ইন্টারনেট ডাউনলোড গতি সেকেন্ডে ১০-২০ কিলোবাইট। তিস্তার চরাঞ্চলে এর গতি ৩-৪ কিলোবাইটে ওঠা-নামা করে। আরেকটি অপারেটরের ইন্টারনেট ডাউনলোড গতি টাওয়ার এলাকায় ৩২০ কিলোবাইট আর গ্রামাঞ্চলে ৫০-৭০ কিলোবাইট পর্যন্ত। চরাঞ্চলে এ গতি ৩০-৫০ কিলোবাইট।

সরকারি অপারেটর টেলিটকের সিম শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট সুবিধা দিতে বিক্রি করা হলেও এটি কোনো কাজেই আসছে না। বেশির ভাগ সময় ইমার্জেন্সি সার্ভিসে আটকে যায়। এই অপারেটরের সর্বোচ্চ ইন্টারনেট গতি ২-৩ কিলোবাইটেই সীমাবদ্ধ।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন ময়মনসিংহের আঞ্চলিক প্রতিনিধি আলম ফরাজী, রংপুরের আঞ্চলিক প্রতিনিধি সীমান্ত সাথী, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি শেখ মামুন-উর-রশিদ এবং কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি মো. মোস্তাফিজুর রহমান।)