১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
খসড়া ড্যাপের অসঙ্গতি দূর করতে হবে: আইএবি
প্রকাশিত : নভেম্বর ২৪, ২০২০ ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউকের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) নতুন খসড়ায় অনেক অসঙ্গতি রয়েছে উল্লেখ করে তা সংশোধন, বিয়োজন ও পরিমার্জনের পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (আইএবি)। সংগঠনটি বলছে, নতুন ড্যাপে জননিরাপত্তা, জনমতের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো ধরণের ইনোভেশন আইডিয়া এখানে নেই। যেসব কারণে ২০১০ সালের ড্যাপ বাস্তবায়ন করা যায়নি সেসব কারণ এই ড্যাপেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাছাড়া ড্যাপে জলাধারের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে দেওয়াসহ নানা অসঙ্গতি দেখতে পাচ্ছেন তারা। দরিদ্র মানুষের কথা চিন্তা না করে একটি বিশেষ শ্রেণিকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার (২৪ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ স্থপতি ইনসটিটিউটে (আইএবি) ‘ঢাকা মহানগর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষে এসব কথা বলা হয়।

সংগঠনটির পক্ষে বলা হয়, আমাদের বিশ্বাস দ্রুত নগরায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের কারণে ভবিষ্যতের ঢাকা হওয়া উচিত মহিলা, শিশু ও ভিন্নভাবে সক্ষমদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শহর। সকল আয়ের মানুষকে সমান অধিকার ও সুবিধা প্রদান করা উচিত। জলবায়ু পরিবর্তন ও মহামারি মোকাবিলার জন্য একটি অভিযোজিত এবং স্থিতিস্থাপক শহর। উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত প্রজন্ম তৈরির জন্য ঢাকা একটি স্বাস্থ্যকর শহর হওয়া উচিত। এগুলো আলোচনার মাধ্যমে আরও পরিশীলিত হলে একটি যথাযথ ড্যাপ জনগণের জন্য উপস্থাপিত হবে। কারণ আগামীর শহর কারও একার চিন্তার ফসল নয়, যা সকলের। তাই সম্মিলিতভাবে সমস্যা সমাধানে সকলের সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

সংগঠনটি বলছে, তথাকথিত মুখ্য জলস্রোত ছাড়া সাধারণ জলস্রোত শর্ত সাপেক্ষে ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন ও স্থাপনা অনুমোদনের যে প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে তা আইন আদালতের আদেশ ও জনস্বার্থ বিরোধী। এরকম প্রস্তাব গৃহীত হলে নগরে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ভূ-গর্ভস্ত পানি স্তরের আশঙ্কাজনক হ্রাসের ঝুঁকিতে থাকা ঢাকা তার ৭০ ভাগ প্রাকৃতিক জলাশয় হারাবে এবং প্লাবন ভূমি সংকুচিত হয়ে ৬৬ ভাগের পরিবর্তে ১৭ ভাগে নেমে আসবে। তারা আরও বলছেন, ড্যাপে আদালত কর্তৃক ঘোষিত ২২০০ স্থাপনাকে ঐতিহাসিক বা হেরিটেজ সাইট হিসাবে ঘোষণা করে তা সংরক্ষণের প্রস্তাবনা সংযোজন করতে হবে।

ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালাকে প্রস্তাবিত ড্যাপে বৈরী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বিষয়টি সঠিক নয় কারণ এ বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি প্লটে বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারিত পরিমাণ ভূমি উন্মুক্ত রাখা, প্রতিটি প্লটে আলোবাতাসহ সবুজের সংস্থান এবং বৃষ্টির পানি রিচার্জ সুবিধা সামগ্রিকভাবে ভবনে বসবাসরত জনগণের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই বিধিমালার নেতিবাচক প্রভাবের প্রমাণ দেওয়ার জন্যই কোনও সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিাপন করা হয়নি।

ড্যাপের জনঘনত্ব বিন্যাস পরিকল্পনাও যথাযথ হয়নি বলে মনে করে স্থপতি ইনস্টিটিউট। তাতে বলা হয়েছে, ড্যাপ ডকুমেন্টটিতে কীভাবে বিভিন্ন এলাকার ঘনত্বকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে না। এ সম্পর্কিত কারিগরী সমীক্ষা প্রকাশ করতে হবে এবং বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া উচিত। ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণে, ব্যাংকক-হংকংয়ের মতো বেশিরভাগ আধুনিক শহরে এফএআর প্রয়োগ করা হয়। তবে প্রস্তাবিত ড্যাপ তার প্রভাবগুলোর বিশদ বিশ্লেষণ ছাড়াই উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করেছে।

ড্যাপের ব্লক উন্নয়ন নিয়েও আপত্তি করেছেন স্থপতিরা। তারা জানিয়েছেন, ড্যাপের প্রস্তাব অনুযায়ী পাঁচ একর বা তার অতিরিক্ত প্লটে ব্লক ডেভেলপমেন্টের কথা বলে সীমাহীন উচ্চতায় যত খুশি আবাসিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রভাব জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের মূল চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এখানে অনেক বেশি কেসস্টাডি এবং সিমুলেশন মডেলিং করে তারপর এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

সাংবাদ সম্মেলনে স্থপতি এহসান খান বলেন, ‘আমরা ড্যাপ প্রত্যাখান করছি না। আমরা চাই এর ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করা হোক। সব মানুষের মতামতের ভিত্তিতে ড্যাপ প্রণয়ন করা হোক। ড্যাপে বলা হয়েছে, ৫ একরের বেশি জমি থাকলে ইচ্ছে মতো উচ্চতায় ভবন নির্মাণ করতে পারবেন। কিন্তু যার এ পরিমাণ জমি নেই তার ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এখন এক একর জমিতো আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের থাকে না। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বা বড় বড় কোম্পানিগুলোর এ পরিমাণ জমি থাকে। তাহলে রাজউকতো দ্বৈততা অনুসরণ করেছে। এটা হতে পারে না।’

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘প্রযুক্তির মাধম্যে ভবিষ্যৎ ঢাকার ত্রিমাত্রিক মডেলিং করতে হবে। রাজউককে সংস্কার করতে হবে। তাদের দ্বারা এই প্ল্যান তৈরি করাই ঠিক হয়নি। আগেও অভিভাবকহীন ড্যাপ বাস্তবায়ন করা যায়নি। উঁচু ভবনের দোষ দিয়ে বিতর্ক তৈরি করে নিচ দিয়ে সব দখল করে নেওয়া হচ্ছে। রাজউক তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এই খসড়াকে প্রত্যাখ্যান করছি না। তবে এর সংশোধন ও পরিমার্জন প্রয়োজন। এতে দুর্বল ডকুমেন্টস ও ভুল তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ এক শ্রেণির স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনসটিটিউটের (আইএবি) সভাপতি স্থপতি জালাল আহমেদ, সাবেক সভাপতি স্থপতি কাজী গোলাম নাসির, সাবেক সভাপতি স্থপতি আবু সাইদ এম আহমেদ, স্থপতি এহসান খান, স্থপতি ফরিদা নিলুফার, স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম, স্থপতি ইশতিয়াক জহির প্রমুখ।