১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
খসড়া ড্যাপ যুগোপযোগী করতে ১১ সংস্কার প্রস্তাব: বিআইপির সংবাদ সম্মেলন
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ০৩, ২০২০ ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

ডেস্ক রিপোর্ট: রাজউকের খসড়া ড্যাপ যুগোপযোগী করতে ১১ দফা সংস্কার প্রস্তাব করেছে পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, রাজউকের ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে বাসযোগ্য ও পরিকল্পিত উন্নয়ন করতে হলে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। নইলে এ পরিকল্পনা থেকে কার্যকর সুফল মিলবে না।

রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ারে সংগঠনের পক্ষ থেকে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাব করা হয়। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিআইপির সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেয়াসহ খসড়া ড্যাপের সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন বিআইপির সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। উপস্থিত ছিলেন বিআইপির নির্বাহী কমিটির সদস্যরা।

বিআইপির ১১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে-১. রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) খসড়া ড্যাপে ঢালাও মিশ্র ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা না হয়ে সীমিত পরিসরে মিশ্র ব্যবহার করা যেতে পারে। সেসব সংশ্লিষ্ট আবাসিক এলাকার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। তা না হলে ওই আবাসিক এলাকার পরিবেশ নষ্ট হবে। জননিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করবে।

২. বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল সংরক্ষণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া চলবে না। জলাধার আইন ২০০০-এ বলা নেই, এমন কোনো পরিভাষা ড্যাপে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। এতে জটিলতার সৃষ্টি করবে। যেমন: মুখ্য জলস্রোত, সাধারণ জলস্রোত-এ ধরনের পরিভাষা জলাধার আইনে না থাকলে এসব চূড়ান্ত ড্যাপে অন্তর্ভুক্ত করা চলবে না।

৩. খসড়া ড্যাপে কৃষি এলাকার কথা বলা হয়েছে। কৃষিভিত্তিক শিল্প, ইকো রিসোর্ট করার কথা বলা হয়েছে। এসব কোন অঞ্চলে হবে, সেটাও সুনির্দিষ্ট করতে হবে।

৪. খসড়া ড্যাপে পরিকল্পনার সুন্দর কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মেট্রো স্টেশনভিত্তিক ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি), ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটসহ (টিডিআর) বেশ কিছু বিষয় রয়েছে। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট পলিসি থাকতে হবে। তা না হলে এটা বাস্তবায়ন করা যাবে না। ড্যাপ যদি এখন গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়, তাহলেও দ্রুততম সময়ের মধ্যে পলিসিগুলো চূড়ান্ত করতে হবে।

৫. ওয়াটার রিটেনশন পন্ডকে ঘিরে ড্যাপের পরিকল্পনার সঙ্গে ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের সমন্বয় থাকতে হবে। এটা সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এসব ওয়াটার রিটেনশন পন্ড গণপরিসর বা জলের আধার হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

৬. খসড়া ড্যাপে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের সুপারিশ করা হয়েছে। কোথায় কীভাবে কোন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত ব্যাখ্যা থাকতে হবে। শ্রমজীবী, কর্মজীবীদের ব্যাপারে কী ধরনের দিকনির্দেশনা থাকা দরকার-সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

৭. ভূমি ব্যবহার আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কিছু করা যাবে না। কেননা ভূমির শ্রেণির ব্যবহারকে ঘিরেই মূলত মাস্টার প্ল্যান। ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন করা শহরের বিপর্যয় ঠেকানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

৮. যানজট নিরসন ও শহরকে বাসযোগ্য রাখতে হলে জনঘনত্ব কমানোর কোনো বিকল্প নেই। এ কারণে বিআইপি রাজউকের মাস্টার প্ল্যানে জনঘনত্ব কমানোর সুপারিশ রাখছে। নগর পরিকল্পনায় জনঘনত্ব কমানোর অনেক পদ্ধতি আছে। সেখান থেকে ড্যাপে যে কোনোটাই রাখা যেতে পারে। উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করে জনঘনত্ব কমানোর উদ্যোগও নেয়া যায়।

৯. খসড়া ড্যাপে পরিকল্পনার সূচক অনুপস্থিত। চূড়ান্ত ড্যাপে পরিকল্পনার সূচক দেখতে চাই। ড্যাপের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

১০. ড্যাপে বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে থাকতে হবে। আমরা বিকেন্দ্রীকরণ বলতে শহরের মধ্যে বিকেন্দ্রীকরণ বোঝাচ্ছি। একইসঙ্গে জাতীয়ভাবে বিকেন্দ্রীকরণ পলিসি প্রণয়নেরও সুপারিশ করছি।

১১. ড্যাপের পরিকল্পনায় করা সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হলেও একটি কার্যকর রাজউকের প্রয়োজন। বর্তমান রাজউকের পরিচালনা পর্ষদ বা রাজউক বোর্ড আমলানির্ভর। পেশাজীবীদের সমন্বয়ে রাজউকের পুনর্গঠন করে জনবল বাড়ালেই এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। অন্যথায় এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা দুরূহ হবে।

এ ছাড়া রাজউকের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানো ও আঞ্চলিক অফিসগুলোকে আরও বেশি কার্যকর করে গড়ে তুলতে হবে।

লিখিত বক্তব্যে ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, আধুনিক নগর পরিকল্পনার ধারণার বিচারে এ ড্যাপে বেশ কিছু নতুনত্ব আনা হয়েছে। এর মধ্যে মেট্রো স্টেশনভিত্তিক টিওডি, ব্লক ডেভেলপমেন্ট, কমিউনিটি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সেবার বিকেন্দ্রীকরণ, টিডিআর, ওয়ার্ডভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসম্মত সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিনোদন কেন্দ্র সৃষ্টি প্রভৃতি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শহরের মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করবে। এ ছাড়া পথচারীবান্ধব অবকাঠামো তৈরি, বাইসাইকেল লেন উৎসাহিতকরণ, অযান্ত্রিক পরিবহনকে সামগ্রিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করার বিষয়গুলো জোরালোভাবে এসেছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিআইপির সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমরা চাই সবার অংশগ্রহণে একটি সুন্দর ড্যাপ। সে কারণে এ মাস্টার প্ল্যানের শুরু থেকে আমরা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছি। আমাদের পক্ষ থেকে মতামত ও প্রস্তাবনা দিয়েছি। রাজউক তার কিছু মেনেছে। অনেক কিছু মানেনি। আমরা একটি সুন্দর মাস্টার প্ল্যান চাই। যার ভিত্তিতে সুন্দর ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে উঠবে। আশা করি, ড্যাপ প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়গুলো অনুধাবন করবেন।