১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প নামফলকেই ঝুলে আছে খাল খনন
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২০, ২০২০ ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

ডেস্ক রিপোর্ট: তিন বছর আগে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকায় জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প অনুমোদন পায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। অথচ সাড়ে ছয় বছর আগে একই উদ্দেশ্যে নেওয়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খনন প্রকল্পটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি। চলতি বছরের শুরুতে তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন খাল খনন প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন। এক বছর পার হলেও সেই নামফলকেই ঝুলছে প্রকল্পের কাজ। অর্থ সংকটে খাল খনন প্রকল্পটি বাস্তবে দেখা মেলেনি। প্রকল্প সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এক হাজার ২৫৬ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৯৪২ কোটি টাকা অর্থায়ন করার কথা ছিল সরকারের, যা মোট ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ। বাকি ২৫ শতাংশ অর্থাৎ ৩১৪ কোটি টাকা জোগান দেওয়ার কথা সিটি করপোরেশনের। কিন্তু তহবিল সংকটের কারণে সে টাকার জোগান দিতে ব্যর্থ হয়েছে সংস্থাটি। ফলে জলাবদ্ধতা নিরসনের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটি বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন খালটি খনন করা না হলে চউকের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সুফল মিলবে না।

খাল খনন প্রকল্প পরিচালক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পের ৯০ শতাংশ টাকা ব্যয় হবে জমি অধিগ্রহণে। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণের ২০৮ কোটি ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের ১০৬ কোটি টাকা সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয়ের কথা ছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশনের ৩১৪ কোটি টাকা ব্যয়ের সামর্থ্য নেই। জেলা প্রশাসনকে এক হাজার ১৫০ কোটি টাকা একসঙ্গে দিতে না পারায় ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াও আটকে আছে। প্রকল্পের সম্পূর্ণ টাকা সরকারি তহবিল থেকে দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে প্রকল্প সংশোধন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘চউকের জলাবদ্ধতা প্রকল্পের সুফল পেতে গেলে এই খাল খনন করা অত্যন্ত জরুরি। ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রামের জন্য যে ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা করা হয়, তাতে তিনটি নতুন খাল খননের সুপারিশ করা হয়েছিল। এর একটি হচ্ছে বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন। এটি খনন করা না হলে নগরের একাংশের জলাবদ্ধতা সমস্যা থেকে যাবে। সুতরাং জলাবদ্ধতা নিরসনে এ খাল খননের কোনো বিকল্প নেই।’

প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতায় বাড়ছে ব্যয়ও : সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ২৪ জুন জাতীয় অর্থনীতি পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৮৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ ছাড় না হওয়ায় বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। প্রথম দফায় ৩৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩২৬ কোটি ৮৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। সরকারি বরাদ্দ ও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরুই করতে পারেনি সিটি করপোরেশন। এখন প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৫৬ কোটি ১৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত।

অর্থ সংকটে আটকে আছে ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে হবে ২৫ একর। প্রথমবার ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২২৪ কোটি ১৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সিটি করপোরেশন বরাদ্দ পেয়েছে মাত্র ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ মিলেছে ৬০ কোটি টাকা। পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে খাল খননের কোনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি সিটি করপোরেশন। ভূমি অধিগ্রহণের টাকা একসঙ্গে দিতে না পারায় অধিগ্রহণ কার্যক্রমও শুরু করতে পারেনি জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে মৌজা রেট বাড়িয়েছে সরকার। ফলে বেড়ে যায় ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয়। এখন ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৩ কোটি টাকা, যা আগের চেয়ে ৮৭৯ কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে ৯৪২ কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দ মিললেও বাকি ২০৮ কোটি টাকা জোগাতে পারেনি সিটি করপোরেশন। ফলে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াও ঝুলে আছে। প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য পাঁচটি লট করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি লটের ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিলেছে। খালটির দৈর্ঘ্য হওয়ার কথা ছিল ২ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৬৫ ফুট। খালের উভয় পাড়ে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ ও ২০ ফুট প্রস্থের সড়ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৯৯৫ সালে প্রণীত ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানে তিনটি নতুন খাল খননের সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন ছিল একটি। প্ল্যানে থাকা এই খালটি খননের উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। খালটি খননের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব কর্মসূচি (ডিপিপি) তৈরি করে ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।