১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
ঢাকায় সাবওয়ে নির্মাণ: শুরুতেই সমন্বয়হীনতা জটিলতার শঙ্কা
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২০, ২০২০ ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

ডেস্ক রিপোর্ট: রাজধানীকে ঘিরে ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাতালপথ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। পাতালপথে চলবে হালকা ট্রেন। প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা খরচ করে বর্তমানে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রাথমিক নকশা তৈরি করছে সংস্থাটি। ঢাকাকে ঘিরে দীর্ঘতম পাতাল রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজটির শুরুতেই দেখা দিয়েছে সমন্বয়হীনতা।

ঢাকা ও আশপাশের এলাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকার প্রথম ২০০৪ সালে একটি মহাপরিকল্পনা (স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা এসটিপি) তৈরি করে। ২০১৫ সালে এটি সংশোধন করা হয়। মহাপরিকল্পনায় ঢাকার জন্য যেসব অবকাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়, তার মধ্যে এ সাবওয়ে কোথাও ছিল না। মহাপরিকল্পনার বাইরে গিয়ে সাবওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থাপনাকে শৃঙ্খলায় আনার বদলে বিশৃঙ্খলা আরো বাড়াতে পারে বলে অভিমত পরিবহন বিশেষজ্ঞদের।

মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ)। আইন অনুযায়ী, ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণের কোনো প্রকল্প বা কর্মসূচি গ্রহণ করার আগে ডিটিসিএর সম্মতি নিতে হয়। পাশাপাশি অনুমোদন করিয়ে নিতে হয় প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা। তবে এখন পর্যন্ত সাবওয়ে নির্মাণের জন্য ডিটিসিএর কাছ থেকে এ ধরনের কোনো অনুমোদন নেয়নি সেতু কর্তৃপক্ষ। ডিটিসিএর কর্মকর্তারা বলছেন, অনুমোদন না নিয়ে এভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তা ঢাকার বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বিত হবে না। এতে ভবিষ্যতে পরিবহন ব্যবস্থাপনায় গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক ও সরকারের সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেনের দাবি, সাবওয়ে নির্মাণের জন্য ডিটিসিএর কাছ থেকে অনুমোদন নেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় রয়েছে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ঢাকা সাবওয়ের জন্য ডিটিসিএর কাছ থেকে অনুমোদন নেয়া হয়নি, তা ঠিক। তবে বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে আমরা একাধিক সভা করেছি। এসব সভায় ডিটিসিএর সঙ্গে আমাদের সাবওয়ে নির্মাণ ইস্যুতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

বর্তমানে ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি অ্যান্ড প্রিলিমিনারি ডিজাইন ফর কনস্ট্রাকশন অব ঢাকা সাবওয়ে’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেতু কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প ব্যয় ৩২১ কোটি টাকা। গত আগস্ট পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি ৫৭ শতাংশ। স্পেনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ করছে। ঢাকার জন্য শুরুতে চারটি সাবওয়ে রুট চিহ্নিত করা হলেও এখন তা ১১টিতে উন্নীত করা হয়েছে।

৯০ কিলোমিটার সাবওয়ে বাড়িয়ে করা হয়েছে ২৫০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সাবওয়ে রুট ‘বি’ হবে ৩০ দশমিক ৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ। গাবতলী থেকে মিরপুর-১১, বিমানবাহিনী সদর দপ্তর, বসুন্ধরা ব্লক-ডি, পূর্বাচল সেক্টর-১৫ থেকে ভোলাব ইউনিয়ন রোড পর্যন্ত যাবে এ সাবওয়ে। ১৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার হবে রুট ‘ডি’ কেরানীগঞ্জের ভাওয়াল থেকে ঠুলঠুলিয়া (পূর্ব খিলগাঁও) পর্যন্ত। গাবতলী থেকে বসুন্ধরা রিভারভিউ পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে রুট ‘জি’। সাবওয়ের ‘ও’ রুট হিসেবে বলা হয়েছে টঙ্গী জংশন থেকে ঝিলমিল এলাকাকে, যার দৈর্ঘ্য ২৮ দশমিক ৭১ কিলোমিটার। রুট ‘পি’ শাহকবির মাজার রোড থেকে সদরঘাট পর্যন্ত। রুট ‘এস’ কেরানীগঞ্জ থেকে সোনাপুর। দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত হবে রুট ‘টি’। রুট ‘ইউ’ ধরা হয়েছে তেঘরিয়া বাজার-নারায়ণগঞ্জ অংশকে। আর রুট ‘ডব্লিউ’র মধ্যে পড়েছে গাবতলী থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, যার দৈর্ঘ্য ১৫ দশমিক ৫২ কিলোমিটার।

এর মধ্যে সবার আগে নির্মাণ করা হতে পারে টঙ্গী-সদরঘাট সাবওয়ে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা বলছেন সেতু বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ সাবওয়েতে ও কোরিয়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (কেআইএনডি) বিনিয়োগ করতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পিপিপি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি বৈঠকও করেছে কেআইএনডি।

গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ডিটিসিএর ১৪তম বোর্ড সভায় ঢাকা সাবওয়ে প্রকল্পের অনুমোদন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সভার কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য এখনো সেতু কর্তৃপক্ষ ডিটিসিএর কাছ থেকে অনুমোদন নেয়নি। এর ফলে ঢাকার পরিবহন নেটওয়ার্কে সমন্বয়হীনতা ও ভবিষ্যতে গুরুতর সমস্যা হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয় সভার কার্যপত্রে।

শুধু ঢাকা সাবওয়ে নয়, ঢাকার যোগাযোগ অবকাঠামো কেন্দ্রিক আরো চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ডিটিসিএর কাছ থেকে নকশা অনুমোদন না নিয়ে। এর মধ্যে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর, বাকি দুটি বাস্তবায়ন করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সওজ অধিদপ্তর মিরপুর ডিওএইচএস গেট-২ থেকে মিরপুর ১২ বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মহাসড়ক প্রশস্ত ও মজবুত করছে। এছাড়া হাতিরঝিল-শেখের জায়গা-আমুনিয়া-ডেমরা সড়ক উন্নয়ন করছে। এগুলোর নকশা ডিটিসিএর কাছ থেকে অনুমোদন নেয়নি সংস্থাটি। একইভাবে রাজউক পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়ক থেকে মাদানি অ্যাভিনিউ-সিলেট মহাসড়ক পর্যন্ত সংযোগ সড়ক ও কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের দুই পাশে ১০০ মিটার চওড়া খাল খনন ও উন্নয়ন করছে।

এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রাকিবুর রহমান বলেন, যেসব প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা আমাদের অনুমোদন না নিয়ে করা হচ্ছে, সেসব প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে আমরা নকশা অনুমোদন করিয়ে নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছি।