১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
পোরশায় ঘর হস্তান্তরের এক বছরেই দেখা দিচ্ছে ফাটল
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ৩০, ২০২০ ৪:১১ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

ডেস্ক রিপোর্ট:নওগাঁর পোরশা উপজেলায় ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে টিআর-কাবিটা কর্মসূচির আওতায় গৃহহীনদের জন্য ৫৩টি দুর্যোগসহনীয় ঘর নির্মাণ করে দেয় সরকার। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আরো ১০টি ঘর নির্মাণ করা হয়।

এসব ঘর হস্তান্তর করা হয় ১০ মাস থেকে এক বছরের মধ্যে। হস্তান্তরের মাত্র এক বছরের মধ্যেই অধিকাংশ ঘরে দেখা দিচ্ছে ফাটল।

অভিযোগ রয়েছে, গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগসহনীয় ঘর নির্মাণ প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ‘ম্যানেজ’ করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে এসব ঘর। এছাড়া সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রণয়নেও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন অনেক ভুক্তভোগী। টাকা দিতে না পারায় অনেক হতদরিদ্রের ভাগ্যে জোটেনি সরকার থেকে বরাদ্দকৃত ঘর।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে গৃহহীনদের জন্য ৬৩টি ঘর নির্মাণে ১ কোটি ৭০ লাখ ৩৯ হাজার ৯৪০ টাকায় বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে হতদরিদ্র গৃহহীন পরিবারের জন্য রান্নাঘর ও টয়লেটসহ ৫৩টি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুই কক্ষবিশিষ্ট ১০টি সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৪টি ঘর নির্মাণ করে হস্তান্তর করা হয়। এছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে আরো ২৯টি ঘর নির্মাণের পর হস্তান্তর করে প্রশাসন। ওই অর্থবছরই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আরো ১০টি ঘর নির্মাণ করা হয়। উপজেলার মশিদপুর, গাঙ্গুরিয়া ও ঘাটনগর ইউনিয়নের দুর্যোগসহনীয় ২৩টি ঘর ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পাঁচটি ঘর নির্মাণ করা হয়। সম্প্রতি এ তিন ইউনিয়নে সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরের পলেস্তরা খসে পড়ছে। বেঁকে গেছে দরজা-জানালার কাঠ। কয়েকটি ঘরের দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মাণকাজ করায় দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। পলেস্তরা খসে পড়ছে, দরজা ও জানালার কাঠ বেঁকে যাচ্ছে। ছাউনিতে রুয়ার (মোটা কাঠ) পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে বাটাম (পাতলা কাঠ)।

উপজেলার মশিদপুর ইউনিয়নের শিশা আদিবাসীপাড়ার বিধবা মিনি বলেন, আমার বাড়ির সামনেই পুকুর। যথেষ্ট জায়গা থাকা সত্ত্বেও একপাশে বাড়িটি চাপিয়ে ঘর তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ঘরের একপাশের দেয়ালে প্লাস্টার করা হয়নি। অনেক জায়গায় প্লাস্টার ফেটে গেছে। নির্মাণের মাত্র পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যেই যদি ঘরের এ অবস্থা হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এসব ঘর আপনা আপনি ভেঙে পড়বে।

গাঙ্গুরিয়া ইউনিয়নের কাতিপুর গ্রামের রাজু রায়হানের স্ত্রী মারজিনা খাতুন বলেন, ছাউনির কাজে রুয়া ব্যবহার করা হয়। কিন্তু রুয়ার পরিবর্তনে বাটাম (পাতলা কাঠ) ব্যবহার করা হয়েছে। যে প্লাস্টার করা হয়েছে এখনই তা খসে পড়ছে। মিস্ত্রিরা পাঁচ বস্তা সিমেন্টের কথা বলেছিল। সিমেন্ট দিলে আরো ভালো কাজ হবে। আমরা গরিব মানুষ দিন আনা দিন খাওয়া সিমেন্ট কেনার টাকা কোথায় পাব। এছাড়া জানালা-দরজার কাঠ ভালো না। শুকিয়ে ফাঁকা হয়ে বেঁকে গেছে।

সরাইগাছী গ্রামের মাসুদ বিল্লা সিদ্দিকী বলেন, স্থানীয় মেম্বার ও চেয়ারম্যানকে ঘরের তালিকায় আমার নাম রাখার অনুরোধ করেছিলাম। মেম্বার একদিন ডেকে নিয়ে আমার কাছে ৫ হাজার টাকা চাইলেন। আমি টাকা দিতে না পারায় বাড়ির তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাই।

গাঙ্গুরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক ঘর বরাদ্দে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কালিনগর গ্রামে শফিউদ্দিন নামে যাকে ঘর দেয়া হয়েছে, তারা অত্যন্ত গরিব।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা দোস্তদার হোসেন বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাড়ির একটি দেয়ালে প্লাস্টার করা সম্ভব হয়নি। কারণ মিস্ত্রির চাপানো জায়গার মধ্যে ঢুকে প্লাস্টার করা সম্ভব না। তবে বাড়ি নির্মাণে উপজেলার কোথাও নিম্নমানের এবং কোনো ধরনের অনিয়ম করা হয়নি।

পোরশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো, নাজমুল হামিদ রেজা বলেন, বিষয়টি যাচাই করে দেখব। যদি কোনো ধরনের ত্রুটি পাওয়া যায় তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াসহ ত্রুটি সংশোধনের ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগটি সঠিক নয়।