১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
প্রকৌশলী-ঠিকাদারের বিরুদ্ধে শাস্তির নির্দেশ সড়কে পায়ে পায়ে অনিয়ম
প্রকাশিত : জানুয়ারি ০৬, ২০২১ ৪:৩৭ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্মাণ প্রকল্পে প্রতিটি ধাপে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। তিনবার মেয়াদ বৃদ্ধি করেও সড়কের কাজ শেষ না হওয়া এবং কাজের নিম্নগতির পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। ওই তদন্তে নেমে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। ডিজাইন ত্রুটি, ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে ধীরগতি ও নিম্নমানের কাজ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সময় অপচয়ের কারণে দায়ীদের শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

সূত্রমতে, সওজের বরিশাল জোনের অধীনে ‘চরখালী-তুষখালী-মঠবাড়িয়া-পাথরঘাটা সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পে অনিয়ম ও দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুরুতে এ প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নে ছিল ডিজাইন ত্রুটি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমিতে সড়ক প্রশস্ত করার ডিজাইন করা হয়। অথচ নেওয়া হয়নি অনাপত্তি। তা ছাড়া ডিজাইনে আরও বেশ কিছু ত্রুটি ধরা পড়ে। প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরুর এক বছর পর নানা জটিলতা শেষে অনাপত্তি সংগ্রহ করে সওজ। এর পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে বহিরাগতদের দিয়ে। অর্থাৎ সওজের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ঠিকাদার অন্য স্থানীয় ঠিকাদার ও জনবল দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল জোড়াতালি দিয়ে। এসব দেখেও না দেখার ভান করেছেন প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। এর খেসারত হিসেবে তিনবার প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি, নিম্নমানের কাজ সবই চলেছে। টেকসই সড়ক উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতার অংশ হিসেবে এ ধরনের কাজে রাষ্ট্রের অপচয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত ৪ জানুয়ারি চিঠি দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

বরগুনা জেলার পাথরঘাটা ও পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়ার সঙ্গে বিভাগীয় শহর বরিশালের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে চরখালী-তুষখালী-মঠবাড়িয়া-পাথরঘাটা সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। এর ব্যয় ১০৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। পর পর তিনবার মেয়াদ বৃদ্ধি, প্রকল্পের কাজের নিম্নগতির কারণে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের দায়

নিরূপণে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের ঠিকাদার ‘তমা কনস্ট্রাকশন’কে ডিবার ও লিকুইডিটি ড্যামেজ (এলডি) আরোপ/জামানত বাজেয়াপ্ত করার কথা বলা হয়। বলে রাখা ভালোÑডিবার মানে কাজে অযোগ্য ঘোষণা করা আর লিকুইডিটি ড্যামেজ আরোপ মানে অতিরিক্ত সময় দিয়ে কাজ শেষ করার সুযোগ দেওয়া এবং বাড়তি প্রতিদিনের জন্য জরিমানা আদায়। এখন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট জোন এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

এ বিষয়ে সওজের বরিশাল জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিন্টু রঞ্জন দেবনাথ বলেন, আমি দায়িত্ব পেয়েছি সম্প্রতি। ঠিকাদারের কাজের অনিয়ম বা অন্য প্রসঙ্গে অবগত নই। এ প্রকল্পের ব্যাপারে আমার জানা তথ্য হচ্ছেÑ এর খরচ ও সময় কিছুটা বেড়েছে। খরচ বেড়েছে মূলত কাজের ধরন বাড়ায়। আর সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী এ বছরের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে কাজ শেষ না হলেও প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হবে।

জানা গেছে, তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ বলেছে, চরখালী-তুষখালী-মঠবাড়িয়া-পাথরঘাটা প্রকল্পের প্যাকেজ ৫-এর ঠিকাদার তমা কনস্ট্রাকশন হলেও তারা নিজস্ব যন্ত্রপাতি ও জনবল ব্যতীত অনুমতি ছাড়াই স্থানীয় ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজটি পরিচালনা করছে। এটি নিশ্চিত হওয়ায় ৮৬৩ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও এ প্যাকেজের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৩৬ শতাংশ। তাই তমা কনস্ট্রাকশনের বিরুদ্ধে ডিবার ও এলডি আরোপ/জামানত বাজেয়াপ্ত করতে বলা হয়। ঠিকাদারের অনুমোদনহীন কার্যাদি জেনেও বিষয়টি প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি ও সময়ের অপচয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

সূত্রমতে, প্রকল্পের ডিজাইনকালে অপরিহার্য কিছু কাজ, যেমনÑ ডিবিএস বেইজ কোর্স, রিজিড পেভমেন্ট, আরসিসি ড্রেন নির্মাণ, রক্ষাপ্রদ কাজ, প্যালাসাইডিং, বাঁক প্রশস্তকরণ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত না করেই ডিজাইন করা হয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মাঠ ও প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নামের তালিকা সংগ্রহ করে দায়িত্ব অবহেলার জন্য ব্যাখ্যা তলব করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে বলেছে তদন্ত কমিটি। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অনুমোদিত অধিগ্রহণ করা জমিতে বেড়িবাঁধের ওপর নির্মিত হবে জেনেও পাউবো থেকে অনাপত্তি দেওয়া হয়নি। ডিপিপি প্রণয়নকালে/সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সময় বিষয়টি তুলে না ধরে ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন তৈরি করা হয়। এ সমস্যার কারণে অনুমোদনের প্রায় এক বছর পর অনাপত্তি নিতে হয় পাউবো থেকে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগ এবং সওজ প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তলব করে দায়িত্বহীনতা ও কর্তব্যে অবহেলার জন্য ব্যাখ্যা চেয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এ সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়, ২০১৭ সালের ১২ মার্চ থেকে ২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সওজের বরিশাল সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফজলে রাব্বি, ২০১৯ সালের ২১ নভেম্বর থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত মোহাম্মদ হায়দার কামরুজ্জামানের দায়িত্বে অবহেলার কারণে প্রকল্পের কাজ বিলম্ব হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকির ক্ষেত্রে বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দায়িত্বে পালনে অবহেলায় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলেছে প্রকল্প পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখা। প্রকল্প মেয়াদে বরগুনা সড়ক বিভাগে ১০ জন নির্বাহী প্রকৌশলী দায়িত্ব পালন করেন। এ অল্প সময়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর বদলির বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তা ছাড়া প্রকল্পে কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলী/উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের ঢালাও বদলি রোধে মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট বদলি গাইডলাইন প্রণয়ন করতে সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

প্রসঙ্গত, পিরোজপুর জেলার ভা-ারিয়া ও মঠবাড়িয়া উপজেলাকে বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে সড়কটি। এ সড়ক দিয়ে বিশেষত পাথরঘাটার সামুদ্রিক মৎস্যকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাছভর্তি ট্রাক চলাচল করে। সড়কটির গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় এটি যথাযথ মানে প্রশস্ত করার কথা।