১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
প্রথমবার পেরিলা চাষ হচ্ছে মৌলভীবাজারে
প্রকাশিত : নভেম্বর ১২, ২০২০ ৪:৩০ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

ডেস্ক রিপোর্ট: কোরিয়ান তেলবীজ ফসল পেরিলা প্রথমবারের মতো চাষ হচ্ছে মৌলভীবাজারের রাজনগরে। সূর্যমুখী ও সরিষার মতো পেরিলার বীজ থেকেও ভোজ্যতেল উৎপন্ন হয়। পেরিলার আদি নিবাস চীন হলেও দক্ষিণ কোরিয়ায় এর ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে বিশ্বে এটি কোরিয়ান পেরিলা নামে পরিচিত। বাংলাদেশের কৃষকরা এখনো এই পেরিলার ফসলের সাথে খুব বেশি একটা পরিচিত নন। উৎপাদন নিয়ে চলছে নানা গবেষণা। তারই ধারাবাহিকতায় মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলা খলাগাঁও গ্রামে প্রথমবারের মতো পেরিলার চাষ করেন আতিকুর রহমান। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় পরীক্ষামূলকভাবে এক বিঘা জমিতে পেরিলা চাষ করেন তিনি।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, তরতাজা লকলকে পেরিলা গাছে ফুল এসেছে। সবুজ পেরিলা দেখতে মনে হয় এ যেন সবুজের সমারোহ বা কোনো শাকসবজির বাগান। অনেকটা পানপাতার মতো সবুজ এর প্রতিটি পাতা। এ সময় কথা হয় কৃষক আতিকুর রহমানের সাথে। তিনি বলেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো: আবু বক্কর আমাকে পেরিলা চাষ করার জন্য বলেন। কৃষি অফিস থেকে আমাকে বীজ দেয়া হয়। আমনের চারা তোলার পর জমি পতিতই ছিল। ভাবলাম এ পতিত জমিতে নতুন ফসল চাষ করে দেখি কী হয়। নতুন ফসল তাই কম জায়গায় চাষ করি। এ জেলায় আমিই তেল বীজ হিসেবে প্রথম পেরিলা চাষ করেছি। ফলন আশানুরূপ হয়েছে। পেরিলা খেতে মৌমাছির ব্যাপক আনাগোনা ছিল। মনে হয় পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে মধু চাষও সম্ভব। আগামীতে এই ফসল আরো বেশি জায়গায় করবেন বলে জানান তিনি।

উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, মো: আবু বক্কর বলেন, মৌলভীবাজার জেলায় আমারই ব্লকে প্রথম এ ফসল চাষ হয়েছে। মাঠপর্যায়ে চাষাবাদ করার জন্য সব সময় চাষিকে পরামর্শ প্রদান করছি। আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলনও আশানুরূপ হয়েছে। এতে এলাকায় পেরিলা চাষ নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের। পেরিলা চাষাবাদে কৃষকরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি পেরিলাতে শতকরা ৬৫ ভাগই ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে যা শরীরের জন্য অনেক উপকারী। বিশেষত হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক ও ত্বকসহ ডায়াবেটিস রোগ প্রতিরোধে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: শাহাদুল ইসলাম বলেন, এই এলাকায় জুলাই থেকে অক্টোবর মাসে অনেক জায়গা পতিত পড়ে থাকে। আউশ আবাদ হওয়ার পর দুই আড়াই মাস কৃষকেরা জমি ফাঁকা রেখে সরিষা আবাদ করে। যেহেতু এই ফসল আড়াই মাসে উঠে যায় তাই কৃষকদের জমি ফাঁকা রাখার প্রয়োজন নেই অথচ ভালো একটি ফসল উঠে আসবে। ৭০- ৭৫ দিনের মধ্যে এই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। সেই দিক থেকে জমিতে একাধিক ফসল করাও যায়। তিনি আরো জানান, পেরিলার পাতা সবজি হিসেবে এবং বীজকে তেল উৎপাদনে কাজে লাগিয়ে প্রধানত দুইভাবে এর ব্যবহার করা যায়। ফুল এলে পেরিলার ক্ষেতে মৌমাছির ব্যাপক আনাগোনা বাণিজ্যিকভাবে মধু চাষের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে পেরিলার চাষ ব্যাপকতা বাড়াতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক সেক্টর আরো সমৃদ্ধ হবে। তাই জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের দিককে গুরুত্ব দিয়ে এই ফসল চাষ শুরু করা হয়েছে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক, কাজী লুৎফুল বারী বলেন, বাংলাদেশে আবহাওয়ায় অভিযোজন সম্পন্ন হয়েছে নতুন এই তেলজাত ফসল পেরিলা। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আধুনিক হচ্ছে মানুষ। পরিবর্তিত হচ্ছে খাদ্যাভ্যাস। ফলে প্রভাব পড়ছে ভোজ্যতেলে। দেশে যে পরিমাণ তেলবীজ উৎপাদন হয় তা দিয়ে চাহিদার মাত্র ১০ ভাগ পূরণ হয়। আমদানি করতে হয় ৯০ ভাগের বেশি। তাই প্রতি বছর ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়। আমাদের দেশে সরিষা ছাড়া নিজস্ব কোনো ভোজ্যতেল ফসল নেই। সয়াবিনসহ অন্যান্য তেল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। পেরিলা চাষে ভোজ্যতেল আমদানির পরিমাণ কমবে। তাই আমরা পেরিলার চাষ শুরু করলাম। এতে আর্থিকভাবে কৃষকরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পেরিলা দেশে ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি সুস্থ জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন বাংলাদেশের আবহাওয়াতে হেক্টরপ্রতি দেড় টনের বেশি উৎপাদন হবে পেরিলা। এ ক্ষেত্রে দেশে পেরিলার চাষাবাদ সঠিকভাবে বিস্তার করতে পারলে তাহলে দেশের ভোজ্যতেল খাত আরো অনেক সমৃদ্ধ হবে।