১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
বছরে উধাও ৫৫০ কোটি টাকার ৪৫ কোটি ঘনমিটার গ্যাস!
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ১৭, ২০২০ ৪:৪৯ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

ডেস্ক রিপোর্ট: একদিকে জরাজীর্ণ পাইপলাইন, আবার সেই পাইপে অসংখ্য লিকেজ আর অবৈধ সংযোগ। অন্যদিকে আধুনিক ব্যবস্থায় যুক্ত না হতে পারার অক্ষমতা। এসব কারণে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনমিটার গ্যাস উধাও হয়ে যাচ্ছে, যার দাম সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকার বেশি। এর জন্য সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতিকে দায়ী করছেন জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা। তবে সরকারের নীতি নির্ধারকরা বলছেন, পাইপলাইন প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি প্রিপেইড মিটার এবং ইভিসি মিটার স্থাপনের কাজ চলছে। এই কাজগুলো শেষ হলে গ্যাসের সিস্টেম লস কমে আসবে।

গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্যানুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মোট গ্রাহক সংখ্যা ২৮ লাখ ৬৫ হাজার ৯০৭ জন। এর মধ্যে মাত্র দুই লাখ ১২ হাজার ৫০০ গ্রাহক প্রি-প্রেইড মিটারে যুক্ত। অভিযোগ রয়েছে, ৯৬৫ জন কর্মকর্তা ও ১ হাজার ২৬৮ জন কর্মচারীর বৃহৎ এই কোম্পানিটি গ্যাস বিক্রি আর বিল আদায়ে যতটা সচেষ্ট, নিরাপত্তার বিষয়ে ততটা নয়।

সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ৬২২টি লিকেজ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মেরামত করা হয়েছে ৭৮১টি। বাকি ৮১৪টি এখনও অরক্ষিত। এই লিকেজগুলো থেকে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড়ধরনের দুর্ঘটনা। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মেরামত করা হয়েছে ৫ হাজার ৮৭৬টি লিকেজ। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মেরামত করা হয়েছিল ৬ হাজার ৫৮৪টি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিতাসের এক কর্মকর্তা জানান, জরাজীর্ণ পাইপলাইন ও লিকেজের কারণে বছরে যে পরিমাণ গ্যাস নষ্ট হয় তা দিয়ে তিতাসের বিতরণ নেটওয়ার্কভুক্ত তিনটি সার কারখানা দুই বছর অনায়াসে চালানো সম্ভব। নষ্ট হয়ে যাওয়া গ্যাস অথবা যাকে সিস্টেম লস বলা হচ্ছে তার পরিমাণ আরও বেশি। হিসাব তুলে ধরে বলেন, “তাদের ২৭ লাখেরও বেশি মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকের অব্যবহৃত গ্যাস আসলে কোম্পানির ‘সিস্টেম গেইন’। সে হিসাব না ধরেই উপরের সিস্টেম লস বা উধাও হওয়া গ্যাসের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।

দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরন কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। ঢাকা মহানগরী ছাড়াও নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও বৃহত্তর ময়মনসিংহে তিতাসের বিতরণ নেটওয়ার্ট রয়েছে। এর জন্য ১৩ হাজার ১৩৮ কিলোমিটারের লাইন বসিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিদিনের মোট গ্যাস বিক্রির ৫৬ ভাগই তিতাস একা করে। কোম্পানিটির দৈনিক চাহিদা এখন ২০০ কোটি ঘনমিটার। কিন্তু চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় তিতাস ১৮০ কোটির বেশি পায় না।

তিতাস সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ বছর আগে কোম্পানিটির সিস্টেম লস ছিল না। এ প্রসঙ্গে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আলী ইকবাল মো. নুরুল্লাহ সারাবাংলাকে জানান, গ্যাসের লিকেজ মেরামতের পাশাপাশি পাইপলাইনের লিকেজ আগেই যাতে শনাক্ত করা যায় সেজন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ গ্যাসলাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজ চলমান। তিনি জানান, ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার পাইপলাইন প্রতিস্থাপনে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নতুন ২০০ পাইপলাইনও স্থাপন করা হবে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে গ্যাসের সিস্টেম লস কমে আসবে।

জানা যায়, পাঁচ বছর আগে গ্যাস ও বিদ্যুতের সকল গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু কাজের এতটাই ধীরগতি যে এখন পর্যন্ত মাত্র ২ লাখ ১২ হাজার পাঁচশ গ্রাহককে প্রি-পেইডের আওতায় আনা গেছে। এছাড়া আরও ১ লাখ ২০ হাজারের একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এর বাইরে জাপান ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের (জেবিআইসি) অর্থায়নে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ লাখ প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে। প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের পাশাপাশি শিল্প কারখানার জন্য ইলেক্ট্রনিক ভলিউম কারেক্টর (ইভিসি) মিটার স্থাপন করা হচ্ছে।

সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ হাজার ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করে এবং যাদের কোনো গ্যাস বিল বকেয়া নেই তাদের প্রত্যেকেই এখন ইভিসি মিটার পাবেন।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রি-পেইড মিটার স্থাপিত হলে গ্যাস খাতে চুরি, অপচয়, অবৈধ ব্যবহার বন্ধ হয়ে শৃঙ্খলা ফিরবে। আর সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুতের অপচয় ঠেকানোর পাশাপাশি জরাজীর্ণ পাইপলাইন প্রতিস্থাপন, নতুন লাইন স্থাপন, প্রি-পেইড, ইভিসি মিটার স্থাপনের কাজ চলছে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এ খাতে আমূল পরিবর্তন আসবে।’

পাইপলাইন প্রতিস্থাপন, নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, সব গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় আনা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইভিসি মিটার স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্যাসের সিস্টেম লসের পাশাপাশি দুর্নীতিও কমে আসবে বলে মনে করছেন নীতি-নির্ধারকরা।