২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
মাতারবাড়ী এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণ: জাপানি ৩ কোম্পানির বিনিয়োগ প্রস্তাব
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ১০, ২০২০ ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

ডেস্ক রিপোর্ট: মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরে ডেডিকেটেড এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণে ৩টি জাপানি কোম্পানি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবগুলো মূল্যায়নে নির্ধারিত কোনো মাপকাঠি বা ক্রাইটেরিয়া না থাকায় এ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বিপিসি কিংবা জ্বালানি বিভাগ। এ কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এই মেগা প্রকল্পের কার্যক্রম। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ইতিমধ্যে অনেক সময় পার হয়ে গেছে। নীতিমালা তৈরি করতে আরও দেরি হলে এই প্রকল্পে আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে পারে।

বিনিয়োগে আগ্রহী জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো হল- মিতসুই অ্যান্ড কোং লিমিটেডের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম, মারুবেনি কর্পোরেশন এবং সুমিতোমো কর্পোরেশন।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ইতিমধ্যে তিনটি প্রস্তাবই গ্রহণ করা হয়েছে। মতামত বা সুপারিশ না করে সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তাবগুলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ফাইল ফেরত পাঠিয়ে তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করে সুস্পষ্ট রিপোর্ট প্রদান করতে বলেছে। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছে জ্বালানি বিভাগ। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই প্রকল্পের বিনিয়োগকারী নির্ধারণের জন্য কোনো ক্রাইটেরিয়া বা নীতিমালা না থাকায় তারা প্রস্তাবগুলোর তুলনামূলক মূল্যায়নে সমস্যায় পড়েছেন। তাই জ্বালানি বিভাগ চাইছে আগে এ নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করতে। তারপর নীতিমালার ভিত্তিতে বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করতে।

জ্বালানি বিভাগের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির জন্য কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও পরিচালনা করেনি বিপিসি কিংবা জ্বালানি বিভাগ।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ এবং কোনো সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করা ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ভবিষ্যতে নানা জটিলতা ও ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে।

বিপিসি সূত্র জানায়, দেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর মাতারবাড়ীর বহুমুখী ব্যবহারের সম্পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখানে গড়ে তোলা হবে তিনটি পৃথক টার্মিনাল। এগুলো হল- কয়লা আমদানির জন্য কয়লা টার্মিনাল, এলএনজি আমদানির জন্য এলএনজি টার্মিনাল এবং এলপিজি আমদানির জন্য এলপিজি টার্মিনাল।

সূত্র জানায়, জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকার অর্থায়নে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর এবং এর টার্মিনালগুলো নির্মিত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতবছর জাপান সফরে গেলে দেশটির সরকার এসব প্রকল্পে অতিরিক্ত ৩.২ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। পাশাপাশি এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে একটি প্রতিশ্রুতি আদায় করে যে, প্রকল্পগুলো জাপানি কোম্পানির বিনিয়োগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। বাংলাদেশ সরকার পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয় জ্বালানি বিভাগের অধীন রাষ্ট্রীয় তেল আমদানিকারক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছুদিন আগে জাপানি কোম্পানি মিতসুই এর নেতৃত্বে একটি কনসোর্টিয়াম বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি বিনিয়োগ প্রস্তাব পেশ করে।

মিতসুই অ্যান্ড কোং লিমিটেডের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম বিল্ড-ওউন-অপারেট (বিওইউ) ভিত্তিতে এলপিজি টার্মিনাল গড়ে তুলবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করে। এই কনসোর্টিয়ামে যুক্ত করা হয় এসকে গ্যাস নামে একটি কোরিয়ান কোম্পানিকে। সে সঙ্গে স্থানীয় পার্টনার হিসেবে যুক্ত করা হয় ইস্ট কোস্ট গ্রুপকে। এছাড়াও সম্প্রতি জাপানের আরেকটি সংস্থা মারুবেনি কর্পোরেশন যুক্ত হয় এই প্রকল্পের সঙ্গে। তারা ভিটল নামে নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক একটি কোম্পানিকে সঙ্গে নিয়ে বিনিয়োগ প্রস্তাব পেশ করে। কিছুদিন আগে আরেক জাপানি কোম্পানি সুমিতোমো কর্পোরেশনও এ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ্রহ প্রকাশ করে সরকারের কাছে বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দেয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এখন তিনটি জাপানি সংস্থাই এই প্রকল্পটি পাওয়ার জন্য এক চরম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে এবং এ জন্য তারা সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের নিজ নিজ পক্ষে টানার চেষ্টা করছে।

সূত্র আরও জানায় বিপিসি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠকের পর মিতসুই বিপিসির কাছে ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের জন্য একটি প্রস্তাব জমা দেয়। এরমধ্যে বিপিসির জন্য ৩০ শতাংশ ইক্যুইটি দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবে আরও বলা হয়, ইস্ট কোস্ট গ্রুপ ভবিষ্যৎ আমদানিকৃত এলপিজি কিনে নেবে এবং এলপিজি টার্মিনাল থেকে অপারেটর টার্মিনালে পণ্য পরিবহনের জন্য ছয়টি নতুন জাহাজ কিনতে অতিরিক্ত ১৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দেবে। অপর জাপানি সংস্থা মারুবেনি কর্পোরেশনও অনুরূপ ৩০ শতাংশ ইক্যুইটি দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। মারুবেনি ভিটল নামক যে সংস্থাকে অংশীদার হিসেবে সঙ্গে নিয়েছে তারা গত দুই তিন বছর ধরে বাংলাদেশে এলপিজি সরবরাহ করে আসছে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপিসির প্রথমে সম্ভাব্যতা যাচাই করার কাজ হাতে নেয়া উচিত এবং এরপরই একটি সিলেকশন ক্রাইটেরিয়া বা উদ্যোক্তা নির্বাচন নীতিমালা তৈরি করে এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে হাত দেয়া উচিত। তারা বলেন, বিশদভাবে প্রাক-সম্ভাব্যতা এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা ছাড়া এ জাতীয় মেগাপ্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সঠিক হবে না।