১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
রমনার অবকাঠামো উন্নয়নে তাড়াহুড়ো, প্রশ্নবিদ্ধ কাজের মান!
প্রকাশিত : জানুয়ারি ০৬, ২০২১ ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

রাজধানীর রমনা পার্কের অবকাঠামো উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্পের কাজ চলছে। ২০১৮ সালে ৪৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী গত বছরের ডিসেম্বরে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজের ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি শেষ হয়নি। গত বছরের জুন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে করেছে সংসদীয় কমিটি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রকল্পটির কার্যক্রম শেষ করার কথা রয়েছে। এজন্য প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে দ্রুত গতিতে। এদিকে কাজ দ্রুত গতিতে চললেও এর মান নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।

রমনা পার্কে প্রাতঃভ্রমণে আসাদের অনেকেই বলছেন, গত ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজের ধীর গতির কারণে প্রকল্পটি শেষ করতে পারেনি। এজন্য নাকি অসন্তোষও প্রকাশ করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে দেখে গেলেই পারেন যে, কাজের মান কতটুকু ভালো হচ্ছে। এতে তারা সন্তুষ্ট হতে পারবেন কিনা।

রমনা পার্কে প্রাতঃভ্রমণে আসা শফিক আহমেদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি পেশায় একজন প্রকৌশলী। তবে তিনি কোথায় কর্মরত আছেন সে বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি। শফিক আহমেদ জানান, গত ৩০ বছর ধরে রমনা পার্কে প্রাতভ্রমণে আসেন তিনি। রমনা পার্কের অনেক ইতিহাস তার জানা। তার দাবি, এই সরকারের আমলে উদ্যানটির অবকাঠামো উন্নয়ন করা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু কাজের মান খুবই নিম্নমানের। কাজের মান কেমন হচ্ছে সংসদীয় কমিটির সদস্যদের তা সরেজমিনে দেখে যাওয়া উচিত।

এ প্রসঙ্গে গণপূর্তে কর্মরত সুপারেন্টেন্ড ইঞ্জিনিয়ার জামিলুর রহমান বলেন, ‘রমনা পার্কের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ নিম্নমানের হচ্ছে বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। সিডিউল মেনেই কাজ হচ্ছে।’

তবে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির একজন সদস্য নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, তিনিও শুনেছেন রমনা পার্কের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজের নিম্নমানের। বিষয়টি তিনি পরবর্তী বৈঠকে আলোচনায় আনতে পারেন। এছাড়া সরেজমিনে যাওয়ার প্রস্তাব করতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘সংসদীয় কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন এমপি রমনা পার্কে হাঁটতে যান। তিনি নিশ্চয়ই এ বিষয় অবহিত রয়েছেন।’ তবে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, রমনা পার্কে চারটি টয়লেট রয়েছে। সেগুলোর মান উন্নত করা হবে। এছাড়া লেকেরে পার ঘেঁষে সিরামিক ইটের রাস্তা তৈরি ও কাঠের বেঞ্চ নির্মাণ করা হবে এই প্রকল্পের আওতায়। এর পাশাপাশি লেক খনন, শিশু কর্নার আধুনিকায়ন, উদ্যানের চারপাশে এবং ভেতরে প্রায় দুই হাজার লাইট স্থাপন, পার্কের ভেতরের সড়কগুলো সিরামিক ইট দিয়ে সংস্কার, মৎস্য ভবনের গেইট দিয়ে ঢুকে শেরাটনের পেছনের গেইট পর্যন্ত সড়কটি পিচ দিয়ে সংস্কার করা হবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় পার্কের ভেতরে দর্শনার্থীদের বসার জন্য বেঞ্চগুলো নতুন করে করা, শেরাটন হোটেলের পেছনে উদ্যানের নার্সারিটি নতুন করে সাজসজ্জা, ময়লা ফেলার জন্য উদ্যানের ভেতরের রাস্তার পাশে ডাস্টবিনগুলো নতুন করে স্থাপন করা ও রমনার এক পাশে করা হবে শরীরচর্চা কেন্দ্র।

এই উদ্যানটি ১৬১০ সালে মোঘল আমলে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই সময় রমনার পরিসীমা ছিল বিশাল এলাকা জুড়ে। মোঘলরাই রমনার নামকরণ করেন। ১৮২৫ সাল থেকে ব্রিটিশ কালেক্টর ডাউইজের সময় ঢাকা নগর উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। যার অন্যতম ছিল রমনা এলাকার উন্নয়ন। ১৯ শতকে ব্রিটিশ শাসক এবং ঢাকার নবাবদের সহায়তায় এটির উন্নয়ন সাধন করা হয়। ঢাকা শহরের নিসর্গ পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯০৮ সালে লন্ডনের কিউই গার্ডেনের অন্যতম কর্মী আর. এল প্রাউডলকের তত্ত্বাবধানে। শহরের সেই নিসর্গ পরিকল্পনার ফল ছিল রমনা পার্কের উন্নয়ন। ২০ বছর লেগেছিল সে কাজ শেষ হতে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পরও রমনা ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবেই থেকে যায়। শাহবাগ থেকে ইডেন বিল্ডিং (সচিবালয়) পর্যন্ত নতুন একটি রাস্তা করা হয় এবং এই রাস্তার পূর্বদিকের অংশ হয় বর্তমান রমনা পার্ক। আনুষ্ঠানিকভাবে রমনা পার্ক উদ্বোধন করা হয় ১৯৪৯ সালে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম রমনা পার্কের অবকাঠামো উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু করেন। ১৯৭৫ সালের পরের সরকারগুলো উদ্যানটির অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য তেমন কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম হাতে নেয়নি। এরশাদ আমলে শুধু লেকের খনন কাজ করা হয়। এবারই প্রথম উদ্যানের পুরাতন স্থাপনা ভেঙে সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করা হচ্ছে।