১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শতাব্দীপ্রাচীন রামমালা গ্রন্থাগার, অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে দুর্লভ পাণ্ডুলিপি
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ১৯, ২০২০ ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

ডেস্ক রিপোর্ট: কুমিল্লা রামমালা গ্রন্থাগারটি দুর্লভ প্রাচীন হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির সংগ্রহশালা। এটি দেশের প্রাচীন সংগ্রহশালা। গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে পুথি, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা নিদর্শন, যা কালের সাক্ষী হয়ে শতবর্ষ পার করেছে। গবেষকদের কাছে কুমিল্লার রামমালা গ্রন্থাগার এ উপমহাদেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক-বাহক।

অথচ অযত্ন-অবহেলা আর সংরক্ষণের অভাবে দিনদিন ধ্বংসের পথে জেলা শহরের শিক্ষা বোর্ড সড়কের ঈশ্বর পাঠশালায় অবস্থিত গ্রন্থাগারের দুর্লভ সব পাণ্ডুলিপি। তালপাতা, ভূর্জপত্র ও কাঠের মধ্যে খোদাইকৃত বাংলা ও ভারতীয় সংস্কৃতির দুর্লভ পুথি ধুলাবালি আর পোকায় কেটে নষ্ট করছে। গ্রন্থাগারের দুর্লভ বইগুলো জাতীয় সম্পদ এবং এগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন গবেষক ও শিক্ষানুরাগীরা।

লাইব্রেরি-সংশ্লিষ্টরা জানান, এখানে নিয়মিত কেয়ারটেকার নেই। ভবনের দেওয়াল ও ছাদ চুঁইয়ে বৃষ্টির পানি নামে আবার ধুলাবালি জমে, পোকায় কেটে মূল্যবান পুথিসহ দুষ্প্রাপ্য বইগুলো নষ্ট হচ্ছে।

ব্রিটিশ লাইব্রেরি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে রামমালা লাইব্রেরির পুথিগুলো সংরক্ষণ ও তালিকা প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে উদ্যোগের অংশ হিসেবে পুথিগুলোকে মার্কিন কাপড়ে মুড়িয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি পুথিগুলোর তালিকা, কী বিষয়ে লেখা ও কত পাতা রয়েছে এসবের তালিকা করা হয়, যা বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরির অনলাইনে সংরক্ষিত রয়েছে।

প্রকল্প গবেষক হিসেবে যারা যুক্ত ছিলেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, প্রাচীন ৮ হাজার ৪০০ পুথি আমরা মোটা মার্কিন কাপড় দিয়ে বেঁধে রেখেছিলাম। প্রতি বছর কাপড় বদলে দিতে হবে। এর জন্য আধুনিক ভবন নির্মাণ করে, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পুথিগুলো সংরক্ষণ করতে হবে বলে জানান গবেষকরা। কিন্তু রামমালা লাইব্রেরির ভবনটিতে পানি চুঁইয়ে ভেতরে ঢোকে। ভবনটি ‘ড্যাম্প’। সে কারণে পুথিগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক দেবব্রত দত্ত গুপ্ত বলেন, ‘এ গ্রন্থাগারের পুথি বিভাগে তালপাতা, ভূর্জপত্র, পুরোনো কাগজে ও কাঠের মধ্যে হাতে খোদাইকৃত দুর্লভ পুথি আছে। এ পুথি বিভাগটি সংরক্ষণের জন্য একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্সাহিত হয়েছিল এবং প্রায় আড়াই হাজার বই ফিল্ম করে তারা আরকাইভে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ফিল্ম নষ্ট হয়ে যায় দেখে তারা এটা ধারণ কিংবা সংরক্ষণ করতে পারেনি। বর্তমানে গ্রন্থাগারের বদ্ধ ঘরে বইগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আরকাইভের মতো করে বড় আকারের আধুনিক লাইব্রেরির মাধ্যমে দুর্লভ বই ও পুথিগুলো সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম উপকৃত হবে। সরকার যত্ন না নিলে গ্রন্থাগারটি আরো বেহাল হয়ে পড়বে।’

ঈশ্বর পাঠশালা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শুধাংশু কুমার মজুমদার বলেন, ‘বিখ্যাত দানবীর মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য প্রতিষ্ঠিত রামমালা গ্রন্থাগারের মূল্যবান বইগুলো অযত্ন আর অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আধুনিক পদ্ধতিতে এসব বই সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি।’

গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক ইন্দ্র কুমার সিংহ। তার বয়স প্রায় ১০০ বছর। তিনি এ গ্রন্থাগারের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ‘প্রাচীন এ গ্রন্থাগার আমাদের জাতীয় সম্পদ। এরই মধ্যে অনেক বই নষ্ট হয়ে গেছে। সময় থাকতে যত্ন না নিলে পাঠাগার ঐতিহ্য হারাবে। এখানে যে কেউ গবেষণা করতে পারেন। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে এ সম্পদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটি দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রহশালা।’

শতাব্দীপ্রাচীন বইয়ের সংগ্রহশালা

গ্রন্থাগারে বিভিন্ন ধরনের ৩০ হাজার বই ও ৮ হাজার প্রাচীন পুথি রয়েছে। পুথিগুলো সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় লেখা। সংস্কৃত ভাষায় পুথির সংখ্যা ৬ হাজারেরও বেশি। এছাড়া পাণ্ডুলিপিগুলো তালপাতা, কলাপাতা, তুলট কাগজ ও কাঠসহ নানা উপাদানের ওপর লেখা। পুথি বিভাগে ৩০০ থেকে ৪০০ বছর আগের সংস্কৃত ভাষার পুথিও রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসব পুথি সংগ্রহ করা হয়েছে।

দেশ-বিদেশের বহু গবেষক পুথি বিভাগে আসেন গবেষণার জন্য। বর্তমানে এখানে গবেষণার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হয়। রামমালা গ্রন্থাগার মহেশ চ্যারিটেবল ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন দানবীর মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য। তার মাতা রামমালা দেবীর স্মরণে ১৯১২ সালে কুমিল্লা শহরের উপকণ্ঠ শাকতলায় নিজ বাড়ির বৈঠকখানায় তিনি এটি প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় ঈশ্বর পাঠশালার অন্যতম পণ্ডিত সূর্যকুমার স্মৃতিতীর্থ গ্রন্থাগারটি পরিচালনা করতেন। প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত ২৭ জন ব্যক্তি এ গ্রন্থাগারে পুথি দান করেছেন। তাদের নামও রয়েছে গ্রন্থাগারে।

সংস্কৃত ভাষায় লেখা বেশির ভাগ শাস্ত্রগ্রন্থ সাধারণ পাঠকের বোধগম্য হয়নি বিধায় গ্রন্থাগারে কিছু কিছু বাংলা পুস্তক, প্রবাসী, ভারতবর্ষ মাসিক পত্রিকা রাখা হতো। ধীরে ধীরে গ্রন্থাগারে হাতে লেখা প্রাচীন পুথিও সংগৃহীত হতে থাকে। ১৯৫০ সালে শিক্ষা বোর্ডের সামনে মহেশাঙ্গনে রামমালা গ্রন্থাগারটি স্থানান্তর করা হয়। রামমালা গ্রন্থাগারে বর্তমানে তিনটি বিভাগ রয়েছে। গবেষণা, পুথি ও সাধারণ। গবেষণা বিভাগে ভারতীয়, সংস্কৃতি, বেদ, ধর্মসহ বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম সংরক্ষিত আছে। সাধারণ বিভাগে রয়েছে দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন গ্রন্থ। সকাল থেকে দুপুর ও বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাধারণ বিভাগ সব পাঠকের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

মায়ের নামে মহেশ প্রতিষ্ঠা করেন এ লাইব্রেরি

বৃহত্তর কুমিল্লা (সাবেক ত্রিপুরা ও বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া) জেলার নবীনগর উপজেলার বিটঘর গ্রামে ১৮৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য। তার বাবা ঈশ্বরচন্দ্র ভট্টাচার্য্য একজন পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন এবং তার মায়ের নাম রামমালা দেবী। জানা যায়, মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য খুব ভালো রান্না জানতেন। তিনি কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়ার সময় এক বাসায় পাচকের কাজও নিয়েছিলেন। তবে অর্থাভাবে পড়ালেখা দশম শ্রেণির পর আর এগোয়নি। পরে তিনি ব্যবসায়ে নামেন। দিনে দিনে মহেশচন্দ্র অনেক টাকার মালিক হন। কুমিল্লা শহরের মনোহরপুর এলাকায় বর্তমানে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের বিপরীতে লাকসাম সড়কের পূর্ব পাশে ১৯১২ সালে আট একর জায়গায় তিনি ‘মহেশাঙ্গন’ গড়ে তোলেন। ঐ সময় এখানে তিনি তার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেন রামমালা গ্রন্থাগার এবং ১৯১৪ সালে তার বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেন কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালা। পরবর্তী সময়ে তিনি এখানে পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠা করেন দেবালয়, নিবেদিতা ছাত্রীনিবাস, নিবেদিতা প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, মিউজিয়াম ও নাটমন্দির। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তার মায়ের নামে করা ‘রামমালা গ্রন্থাগার’।