১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
সেতুর কাজ তদন্তে গিয়ে মিলল সড়কেরও নির্মাণত্রুটি
প্রকাশিত : জানুয়ারি ০৬, ২০২১ ৫:১৮ পূর্বাহ্ণ
আপডেট : October 05, 2020 8:47 pm

গত বছরের ৪ জুলাই জামালপুর-শেরপুর-বনগাঁও আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর নির্মিত শিমুলতলী সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে যান শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় হুইপ আতিউর রহমান আতিক। গিয়ে জানতে পারেন সেতুটি নির্মাণে নিম্নমানের পাথর ও ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তাত্ক্ষণিক পরিদর্শন করে অভিযোগের সত্যতাও পান। সেদিনই স্থগিত করে দেন সেতুটির নির্মাণকাজ। সেতুটি নির্মাণ করছিল খুলনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মজহার এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড।

হুইপ কর্তৃক সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়ার ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। বিভাগের একজন উপসচিব ও একজন সহকারী সচিবকে দেয়া হয় বিষয়টির তদন্তের ভার। তদন্তের জন্য সরেজমিন পরিদর্শনে আসেন তারা। সেতুর পাইলিংকাজে ব্যবহূত পাথর ও ইটের খোয়া সংগ্রহ করে পাঠান সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের মিরপুর কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারে।

একই সময়ে চলমান দীর্ঘ জামালপুর-শেরপুর-বনগাঁও আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজের গুণগত মানও পরীক্ষা করে মহাসড়ক বিভাগের প্রতিনিধি দল। বিভিন্ন জায়গায় মহাসড়কের পুরুত্ব পরীক্ষা করে দেখে তারা। এতে বেরিয়ে আসে সড়কেরও নির্মাণত্রুটি।

মহাসড়কটি মজবুত ও প্রশস্তকরণের কাজ করছে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওরিয়েন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড, ময়মনসিংহের শামীম এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড ও সিরাজগঞ্জের মেসার্স তূর্ণা এন্টারপ্রাইজ। সওজ অধিদপ্তরের সঙ্গে ঠিকাদারদের করা চুক্তি অনুযায়ী মহাসড়কটির সাববেজ-১-এর পুরুত্ব থাকার কথা ন্যূনতম ২০০ মিলিমিটার। তবে পরীক্ষা করে সাববেজটির পুরুত্ব এ মাত্রায় পাওয়া যায়নি। এ কারণে মহাসড়কটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া ও সংস্কারে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামানের মতে, সাববেজের পুরুত্বের সঙ্গে কোনোভাবেই আপস করা উচিত নয়। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, মহাসড়কের সবার নিচে থাকে সাবগ্রেড। এটা একেবারে মাটির নিচে থাকে। এরপর করা হয় সাববেজ। এ ধাপটিতে বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করা হয়। সাববেজের পর বেজকোর্স করা হয়। সবার শেষে করা হয় ওয়ারিংকোর্স। সাববেজের পুরুত্ব যথাযথ না হলে সড়ক দেবে কিংবা ভেঙে গিয়ে দ্রুত সড়ক নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর এটি ঠিক করাটাও ঝামেলার কাজ। কারণ সাববেজ ঠিক করতে হলে সবার আগে ওয়ারিংকোর্স তুলতে হবে, এরপর বেজকোর্স তুলতে হবে। অর্থাৎ প্রায় পুরো সড়কটিই নতুন করে করতে গিয়ে সংস্কার ব্যয় নতুন সড়ক নির্মাণের মতোই হবে বলে মনে করেন তিনি।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দুই কর্মকর্তা তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদনে জামালপুর-শেরপুর-বনগাঁও আঞ্চলিক মহাসড়কের সাববেজ-১-এর পুরুত্ব কম রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি পরীক্ষার জন্য পাথর ও ইটের খোয়ার যে নমুনা কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছিল, পরীক্ষায় সেগুলোর মানও যথাযথ মাত্রায় পাওয়া যায়নি।

নিম্নমানের কাজের শাস্তি হিসেবে শিমুলতলী সেতুর ঠিকাদার মজহার এন্টারপ্রাইজকে ছয় মাস, সড়কের ঠিকাদার তূর্ণা এন্টারপ্রাইজ, শামীম এন্টারপ্রাইজ ও ওরিয়েন্ট ট্রেডিংকে দুই বছরের জন্য ময়মনসিংহ জোনে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। শাস্তিকালে এ চার ঠিকাদার সওজ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জোনে নতুন কোনো ক্রয়াদেশ পাবেন না। তবে আগের কাজগুলো চালিয়ে যেতে হবে। এমনকি যেসব কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার হয়েছে, সেগুলোও সম্পন্ন করতে হবে।

চলমান জামালপুর-শেরপুর-বনগাঁও আঞ্চলিক মহাসড়কটির কাজ শেষ করা নিয়ে তাই নতুন করে দেখা দিয়েছে জটিলতা। এরই মধ্যে মহাসড়কটির সিংহভাগ অংশে পিচ ঢালাইয়ের কাজও শেষ করে ফেলা হয়েছে। এমন অবস্থায় সাববেজ-১ নিয়ে যে আপত্তি তোলা হয়েছে, সেটি সংশোধন করতে হলে মহাসড়কটি বলতে গেলে পুনরায় নির্মাণ করতে হবে বলে মনে করছেন সওজ অধিদপ্তরের শেরপুর ডিভিশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কেএম শরিফুল আলম।

নির্মাণকাজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ আগামী জুন পর্যন্ত। তবে নিম্নমানের কাজ ও কালো তালিকাভুক্ত করার পর কাজ বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারদের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করা হতে পারে কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে ঠিকাদারদের কাজ বাতিল করলে প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আবার কাজ বাতিল করা হলে এখন পর্যন্ত ঠিকাদার কী কী কাজ করেছেন, সেগুলোও দাবি করবেন। তখন জটিলতা দেখা দিতে পারে। এখন মন্ত্রণালয় থেকে যে অংশটুকু রিপেয়ার করার কথা বলা হচ্ছে, তা ঠিকাদারদের পক্ষে করা হয়তো সম্ভব না। কারণ, ঠিকাদাররা এরই মধ্যে বিটুমিনাস রোড করে ফেলছেন। রিপেয়ার করতে হলে বিটুমিনাস লেয়ার তুলে ফেলে দিয়ে তারপর কাজটা করা লাগবে, যা ঠিকাদারদের পক্ষে করা সম্ভব হবে না।

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও নির্মাণকাজের অভিযোগ ওঠার পর মহাসড়কটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ আজিজুর রহমান। পরিদর্শন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিমুলতলী সেতুতে ব্যবহার করা পাথর পরীক্ষা করে যথাযথ মানে পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি মহাসড়কটির সাববেজের পুরুত্ব কত ছিল— আমরা পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসবই উল্লেখ করেছি। এর আলোকে চার ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্তি ও সওজ অধিদপ্তরের দুজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি।